শ্রাবণ মাস মানেই ভক্তদের কাছে বাবা ভোলানাথের আরাধনার বিশেষ সময়। এই মাসের সোমবারগুলিতে শিবমন্দিরে জল ঢালতে দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন। আপনিও যদি শ্রাবণের তৃতীয় সোমবারে বীরভূমে গিয়ে শিবপুজো করার পরিকল্পনা করেন, তাহলে জেলার কয়েকটি প্রাচীন ও জনপ্রিয় শিবমন্দির ঘুরে দেখতে পারেন। ইতিহাস, স্থাপত্য, লোকবিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিক আবহ—সব মিলিয়ে এই পাঁচ শিবতীর্থে মিলবে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
ডাবুকেশ্বর মন্দির
বীরভূমের ময়ূরেশ্বর-১ ব্লকের ডাবুক গ্রামে অবস্থিত ডাবুকেশ্বর মন্দির। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এই মন্দিরের সঙ্গে শিবের উন্মত্তেশ্বর রূপের যোগ রয়েছে।
তারাপীঠের কাছাকাছি হওয়ায় একই সফরে দুই তীর্থস্থান ঘুরে নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। শ্রাবণ মাসে শিবভক্তদের আনাগোনায় মন্দির চত্বর হয়ে ওঠে জমজমাট। ভক্তরা এখানে এসে শিবের মাথায় জল অর্পণ করে পুজো দেন।
ঠিকানা: ডাবুক গ্রাম, ময়ূরেশ্বর-১ ব্লক, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ।
যাতায়াত: তারাপীঠ থেকে সড়কপথে ডাবুকেশ্বর মন্দিরে পৌঁছনো যায়।
গণপুর শিবমন্দির
শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাতে চান? তাহলে আপনার গন্তব্য হতে পারে গণপুর। রামপুরহাট থেকে সিউড়ি যাওয়ার পথে অবস্থিত এই এলাকা ঘন শালবনের জন্যও পরিচিত।
জঙ্গলের পরিবেশের মাঝেই রয়েছে প্রাচীন পোড়ামাটির শিবমন্দির। স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতিতে এই স্থানকে বহু প্রাচীন বলে মনে করা হয়। শ্রাবণ মাসে এখানে এসে শিবের পুজো দেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃতির অপূর্ব পরিবেশও উপভোগ করতে পারবেন।
ঠিকানা: গণপুর, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ।
যাতায়াত: রামপুরহাট-সিউড়ি সড়কপথে গণপুরে পৌঁছনো যায়।
মদনেশ্বর শিব মন্দির
বীরভূমের অন্যতম পরিচিত শিবতীর্থ মদনেশ্বর। সাঁইথিয়া স্টেশন থেকে তুলনামূলক সহজেই এই মন্দিরে পৌঁছনো যায়। শুধু ধর্মীয় কারণে নয়, ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্যও এই স্থান বিশেষ আকর্ষণীয়।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় মদনেশ্বর শিব এবং কোটাসুর অঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখতে চারপাশে বিশাল প্রাচীর ছিল। সেই প্রাচীরের দু’টি প্রবেশদ্বারের কথাও স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়। শ্রাবণ মাসে তাই শিবপুজোর পাশাপাশি ইতিহাসের ছোঁয়াও পেতে পারেন এখানে।
ঠিকানা: মদনেশ্বর, কোটাসুর সংলগ্ন এলাকা, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ।
যাতায়াত: সাঁইথিয়া স্টেশন থেকে স্থানীয় যানবাহনে মন্দিরে যাওয়া যায়।
বক্রেশ্বর শিবতীর্থ
বীরভূমের ধর্মীয় মানচিত্রে বক্রেশ্বরের গুরুত্ব আলাদা। একদিকে সতীপীঠ, অন্যদিকে প্রাচীন শৈবতীর্থ—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে বক্রেশ্বর সারা বছরই ভক্ত ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
এখানে বাবা বক্রনাথের পাশাপাশি রয়েছে আরও পাঁচটি শিবলিঙ্গ—কুবেরেশ্বর, সিদ্ধেশ্বর, জ্যোতির্লিঙ্গেশ্বর, কালারুদ্রেশ্বর এবং জম্ভেশ্বর। পাশাপাশি বক্রেশ্বরের উষ্ণপ্রস্রবণও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে শ্রাবণ মাসে এই তীর্থে ভক্তদের ভিড় বাড়ে।
ঠিকানা: বক্রেশ্বর, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ।
বিশেষ আকর্ষণ: বক্রনাথ মন্দির, একাধিক শিবলিঙ্গ, সতীপীঠ এবং উষ্ণপ্রস্রবণ।
মল্লেশ্বর শিব মন্দির
তারাপীঠ থেকে খুব বেশি দূরে নয় মল্লারপুরের প্রাচীন শিবতীর্থ মল্লেশ্বর। এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে একাধিক লোককথা ও কিংবদন্তি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, মহাভারতের সঙ্গে যুক্ত কুন্তী এই শিবের পুজো করেছিলেন।
আরও একটি প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ১১২৪ শকাব্দে রাজা মল্লনাথ এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে মন্দির চত্বরে আরও বেশ কয়েকটি মন্দির গড়ে ওঠে। ফলে ধর্মীয় ভ্রমণের পাশাপাশি ইতিহাস ও প্রাচীন স্থাপত্যের প্রতি আগ্রহীদের কাছেও মল্লেশ্বর বিশেষ আকর্ষণীয়।
ঠিকানা: মল্লারপুর, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ।
যাতায়াত: তারাপীঠ থেকে সড়কপথে মল্লারপুর যাওয়া যায়।
শ্রাবণের তৃতীয় সোমবারে কোথায় যাবেন?
যদি একদিনের মধ্যে শিবতীর্থ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তাহলে তারাপীঠকে কেন্দ্র করে ডাবুকেশ্বর ও মল্লেশ্বর ঘুরে দেখতে পারেন। অন্যদিকে প্রকৃতি ও প্রাচীন মন্দিরের পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে গণপুর ভালো বিকল্প হতে পারে। আর ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি ঐতিহাসিক পরিবেশ দেখতে চাইলে মদনেশ্বর ও বক্রেশ্বর আপনার তালিকায় রাখতে পারেন।তবে শ্রাবণের সোমবারে ভক্তদের ভিড় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় যাত্রার আগে স্থানীয় মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পুজোর সময়, দর্শনের নিয়ম এবং বিশেষ আয়োজন সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো।
Sawan 2026: শ্রাবণ মাসে শিবের মাথায় জল ঢালতে বীরভূমের বিভিন্ন প্রাচীন শিবমন্দিরে ভিড় জমান ভক্তরা। জেলার এমনই পাঁচ ঐতিহ্যবাহী শিবতীর্থ হল ডাবুকেশ্বর, গণপুর শিবমন্দির, মদনেশ্বর, বক্রেশ্বর এবং মল্লেশ্বর। কোনও মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, কোনওটির সঙ্গে রয়েছে নানা লোককথা ও ধর্মীয় বিশ্বাস। শ্রাবণের তৃতীয় সোমবারে পুজো দিতে চাইলে এই পাঁচ শিবতীর্থ হতে পারে আপনার গন্তব্য।













