ট্রাম্পের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে ইউক্রেনের নিরাপত্তা ও ইরান ইস্যুতে আলোচনা জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহুর

হোয়াইট এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। আলোচনায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। হোয়াইট হাউস এই বৈঠকগুলোকে ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়। উভয় নেতা যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে অংশ নিতে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছিলেন। গ্রাহাম দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সহায়তা এবং ইসরায়েলের সমর্থনের অন্যতম প্রবল সমর্থক ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বৃদ্ধি পাওয়ার পর ইউক্রেন ধারাবাহিকভাবে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে আসছে।

বৈঠকের পর জেলেনস্কি বলেন, ট্রাম্প ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দেশীয় উৎপাদনের জন্য লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে যৌথ উৎপাদনের পথে অগ্রগতির আশা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। জেলেনস্কির বক্তব্যকে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে গণ্য হয়। এটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার আকাশ হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম।

রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছে। একটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি একই সঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিহত করতে সক্ষম। তবে এর ব্যয় অত্যন্ত বেশি এবং প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ইউক্রেনের দাবি, দেশের কার্যকর প্রতিরক্ষার জন্য তাদের বিপুল সংখ্যক এ ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন।

হোয়াইট হাউসে বৈঠকের আগে জেলেনস্কি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। একই সময়ে মার্কিন সিনেট রাশিয়ার তেল ও গ্যাস ক্রয়কারী দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব বিপুল সমর্থনে অনুমোদন করে।

জেলেনস্কি এটিকে ইউক্রেনের প্রতি শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে সহায়তা করতে পারে।

জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই নেতার আলোচনার মূল বিষয় ছিল ইরানের কর্মকাণ্ড, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসে। বিশেষ করে লেবাননে সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য দেখা যায়। তা সত্ত্বেও উভয় পক্ষ বৈঠকটিকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছে।

বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, আলোচনা অত্যন্ত ভালো হয়েছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু এটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন।

নেতানিয়াহু বৈঠকের পর বলেন, দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে স্পষ্ট ঐকমত্য হয়েছে যে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সমন্বয় ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত দিকনির্দেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বৈঠকের কিছু সময় পর মার্কিন সেনাবাহিনী দাবি করে, ইরানি বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা চালায়, যা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সব ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রতিহত করা হয়।

একই সময়ে মার্কিন ও সৌদি বাহিনী পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার ফলে অঞ্চলে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এ দাবিগুলোর বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ট্রাম্প, জেলেনস্কি এবং নেতানিয়াহুর বৈঠক এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন বিশ্ব একাধিক বড় নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি। একদিকে ইউক্রেনে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

ইউক্রেন যদি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের যৌথ উৎপাদনের অনুমতি পায়, তবে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বয় আগামী মাসগুলোতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

 

Leave a comment