রেলে ফার্স্ট ক্লাসে ভ্রমণ, তাও আবার আজীবন বিনামূল্যে! সাধারণ যাত্রীর কাছে যা কার্যত অকল্পনীয়, সেই বিশেষ সুযোগই এবার পেলেন বাংলার এক কৃতী সাঁতারু। পূর্ব বর্ধমানের কালনা শহরের বাসিন্দা সায়নী দাসকে তাঁর অসামান্য ক্রীড়া কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে এই বিশেষ সুবিধা দিয়েছে ভারতীয় রেল। ৩০ অগাস্ট ২০২৬ ইস্টার্ন রেলের জেনারেল ম্যানেজারের কাছ থেকে তিনি হাতে পান সেই বিশেষ পাস।
কে এই সায়নী দাস?
ছোটবেলা থেকেই সাঁতারের সঙ্গে পরিচয় সায়নীর। বাবার হাত ধরে সাঁতারে তাঁর পথচলা শুরু। পরবর্তীকালে সাধারণ পুলের সাঁতার ছেড়ে তিনি বেছে নেন আরও কঠিন ওপেন ওয়াটার সুইমিং। উত্তাল সমুদ্র, প্রবল ঠান্ডা জল, দীর্ঘ দূরত্ব—সব প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে শুরু হয় তাঁর কঠিন অনুশীলন।২০১৭ সালে ইংলিশ চ্যানেল জয় করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজের পরিচয় তৈরি করেন সায়নী। এরপর একে একে তিনি পেরিয়েছেন ক্যাটালিনা চ্যানেল, মলোকাই চ্যানেল, কুক প্রণালী এবং নর্থ চ্যানেলের মতো কঠিন জলপথ। পরে জিব্রাল্টার প্রণালীও জয় করেন তিনি।এর ফলে ‘Oceans Seven’-এর সাতটি চ্যানেলের মধ্যে ইতিমধ্যেই ছ’টি জয় করেছেন কালনার এই সাঁতারু।
জাতীয় পুরস্কারও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে
শুধু সমুদ্রজয় নয়, সায়নীর কৃতিত্বের তালিকায় রয়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অ্যাডভেঞ্চার সম্মান। ২০২৩ সালের ওয়াটার অ্যাডভেঞ্চার বিভাগে তিনি তেনজিং নোরগে ন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার অ্যাওয়ার্ড পান।২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে সেই পুরস্কার গ্রহণ করেন সায়নী। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপক হওয়ার সুবাদেই ভারতীয় রেলের নিয়ম অনুযায়ী তিনি বিশেষ যাত্রা সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হন।
কী সুবিধা দিল ভারতীয় রেল?
রেলের তরফে সায়নীকে দেওয়া হয়েছে আজীবন প্রথম শ্রেণির স্লিপারে বিনামূল্যে যাতায়াতের বিশেষ সুবিধা। অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রেলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই পাস ব্যবহার করতে পারবেন তিনি।সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই সুবিধার জন্য তাঁকে আলাদা করে আবেদন করতে হয়নি। দিল্লির রেল বোর্ড থেকে ইস্টার্ন রেলের কাছে যোগাযোগ আসার পর তাঁকে দেখা করার জন্য জানানো হয়। এরপর ৩০ অগাস্ট ইস্টার্ন রেলের জেনারেল ম্যানেজারের কাছ থেকে বিশেষ পাসটি গ্রহণ করেন তিনি।রেলের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী তেনজিং নোরগে, অর্জুন এবং দ্রোণাচার্য পুরস্কারপ্রাপকদের এমন বিশেষ যাত্রা সুবিধা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
রেলের পাস নয়, জাতীয় পুরস্কারই সবচেয়ে বড় গর্ব
আজীবন বিনামূল্যে রেলযাত্রার মতো সম্মান পেলেও সায়নীর কাছে তাঁর জাতীয় পুরস্কারের গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি। তাঁর বক্তব্য, “সবার আগে আমি অ্যাওয়ার্ডি, সেটা আমার কাছে অনেক বড় গর্বের।”তাঁর এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, রেলের বিশেষ সুবিধাকে সম্মান হিসেবে দেখলেও দেশের হয়ে পাওয়া জাতীয় স্বীকৃতিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন।
এখনও বাকি ‘Oceans Seven’-এর শেষ চ্যালেঞ্জ
ছ’টি কঠিন চ্যানেল জয় করে ইতিমধ্যেই অনন্য নজির গড়েছেন সায়নী। তবে তাঁর সমুদ্রজয়ের অভিযান এখনও শেষ হয়নি। ‘Oceans Seven’ সম্পূর্ণ করতে এখনও বাকি রয়েছে জাপানের সুগারু প্রণালী জয়।সেটিই এখন কালনার এই কৃতী সাঁতারুর পরবর্তী বড় লক্ষ্য। অর্থাৎ ভারতীয় রেলের আজীবন ফার্স্ট ক্লাস পাস নতুন সম্মান এনে দিলেও, সায়নীর চোখ এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জের দিকে।
সমুদ্রের দুর্গম জলপথ জয় করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন পূর্ব বর্ধমানের কালনার সায়নী দাস। একের পর এক আন্তর্জাতিক ওপেন ওয়াটার চ্যালেঞ্জ জয় এবং জাতীয় স্তরের সম্মানের স্বীকৃতি হিসেবে এবার তাঁকে আজীবন প্রথম শ্রেণিতে বিনামূল্যে রেলযাত্রার বিশেষ সুবিধা দিল ভারতীয় রেল।












