স্পেনের টোলেডো প্রদেশে বুধবার সকালে দুটি হাই-স্পিড ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনায় বহু যাত্রী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের জেরে একাধিক ট্রেনের কামরা লাইনচ্যুত হয় এবং কিছু কামরা ঢাল বেয়ে নীচে গড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে রেল পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুটি ট্রেনে মোট ৫৪৪ জন যাত্রী ছিলেন।
স্থানীয় সময় অনুযায়ী, বুধবার, ২৮ অক্টোবর সকাল প্রায় ৮টা ৫৪ মিনিটে দুর্ঘটনাটি ঘটে। দুটি ট্রেনই স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ থেকে সেভিলের দিকে যাচ্ছিল। মোর, ওরগাজ এবং উর্দা শহরের মধ্যবর্তী হাই-স্পিড রেললাইনের ১১৮তম কিলোমিটারে দুর্ঘটনাটি ঘটে। একটি ট্রেন ছিল স্পেনের সরকারি রেল সংস্থা রেনফের (Renfe) এবং অন্যটি বেসরকারি সংস্থা ইর্যোর (Iryo)।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইর্যোর ট্রেনটি রেললাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই সময় পিছন দিক থেকে আসা রেনফের AVE ট্রেনটি সেটিকে ধাক্কা মারে। সংঘর্ষের ফলে একাধিক কামরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকটি কামরা লাইনচ্যুত হওয়ায় উদ্ধারকারী দলকে যাত্রীদের কাছে পৌঁছতে সমস্যার মুখে পড়তে হয়।
স্থানীয় প্রশাসন দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৮ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। স্পেনের সংবাদপত্র এল পাইসের (El País) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে ৪৪ জন ইর্যোর ট্রেনের এবং ২৪ জন রেনফের ট্রেনের যাত্রী ছিলেন।
আহতদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। ২৮ অক্টোবর রাত পর্যন্ত পাওয়া প্রতিবেদনে ৫৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করার কথা জানানো হয়েছিল। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর দমকল, পুলিশ এবং চিকিৎসক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। ক্ষতিগ্রস্ত কামরায় আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারের কাজ শুরু করেন উদ্ধারকারীরা।
দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ, সিউদাদ রিয়াল এবং আন্দালুসিয়ার মধ্যে হাই-স্পিড রেল পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে বহু যাত্রী সমস্যায় পড়েন। রেলস্টেশনগুলিতে নিজেদের যাত্রার বিষয়ে তথ্য জানার জন্য অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের। কয়েকটি ট্রেন বাতিল করা হয়। অন্যদিকে, অনেক যাত্রীকে বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা খুঁজতে হয়।
প্রভাবিত যাত্রীদের জন্য টিকিট পরিবর্তন এবং বাতিলের সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে রেনফে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের সহায়তার জন্য একটি হেল্পলাইনও চালু করেছে সংস্থাটি।
![]()
দুর্ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি দেশে তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন।
স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে আশপাশের এলাকায় আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। উর্দায় চিকিৎসক দলগুলির জন্য অস্থায়ী কেন্দ্র তৈরি করা হয়। প্রশাসনিক আধিকারিকরা জানান, মানুষের প্রাণ রক্ষা করা এবং আহত যাত্রীদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়াই তাঁদের প্রাথমিক লক্ষ্য।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। প্রাথমিক তদন্তে রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থা LZB-তে প্রযুক্তিগত ত্রুটির সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে একাধিক ট্রেন থেমে গিয়েছিল। এরপর ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রেল চলাচল শুরু করা হয়।
পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু করার সময় কোথায় গাফিলতি হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। সিগন্যাল ব্যবস্থা, কন্ট্রোল রুম থেকে দেওয়া নির্দেশ এবং ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত দুর্ঘটনার জন্য কোনও একটি নির্দিষ্ট কারণকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা হয়নি।
স্পেনে প্রায় নয় মাস আগেও একটি বড় রেল দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে কর্ডোবা প্রদেশের আদামুজের কাছে ইর্যো এবং রেনফের ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। সেই সময় মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী ইর্যোর ট্রেনের কয়েকটি কামরা লাইনচ্যুত হয়ে অন্য একটি রেললাইনে চলে যায়। ওই সময় বিপরীত দিক থেকে আসা রেনফের ট্রেনটির সঙ্গে সেগুলির সংঘর্ষ হয়। সেই দুর্ঘটনায় ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
একই বছরে দ্বিতীয় বড় রেল দুর্ঘটনার পর স্পেনের হাই-স্পিড রেল ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে দুর্ঘটনার তদন্ত চলছে। দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথে নিরাপদে পরিষেবা পুনরায় চালু করাও রেল কর্তৃপক্ষের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।










