ইজরায়েলে সংসদীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ চলছে। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩১.৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। ১৯৭৭ সালের পর এই সময়ের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ ভোটদানের হার। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রগুলিতে ভোটারদের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সামনে নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। রাত ১০টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। এরপর শুরু হবে ভোট গণনা এবং নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া।
এবারের নির্বাচনে সকাল থেকেই ভোটারদের অংশগ্রহণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সকাল ১০টা পর্যন্ত ১৬.৭ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ভোটগ্রহণের প্রথম তিন ঘণ্টায় প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। দুপুর ১২টা নাগাদ ভোটদানের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩১.৫ শতাংশে।
২০২২ সালের নির্বাচনে একই সময় পর্যন্ত ভোট পড়েছিল ২৮.৪ শতাংশ। তবে এবারের ভোটদানের হারকে সর্বকালের রেকর্ড বলা হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনের ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে দুপুর পর্যন্ত ৩৩.১ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ফলে বর্তমান হার ১৯৭৭ সালের পর একই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তাঁর লিকুদ পার্টি এবং দক্ষিণপন্থী সহযোগীদের সমর্থনে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট তাঁর ইয়াশার পার্টির মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত একাধিক সমীক্ষায় আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলি নেতানিয়াহুর জোটের তুলনায় বেশি আসন পেতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে কোনও পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। এই পরিস্থিতিতে ছোট রাজনৈতিক দলগুলির সমর্থন এবং নির্বাচনের পর জোট গঠনের আলোচনা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইজরায়েলের সংসদকে নেসেট বলা হয়। সংসদে মোট ১২০টি আসন রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন।
দেশে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা হয় না। ভোটাররা রাজনৈতিক দলগুলির তালিকার পক্ষে ভোট দেন। দেশজুড়ে প্রতিটি দল যত শতাংশ বৈধ ভোট পায়, সেই অনুপাতের ভিত্তিতে সংসদে আসন বণ্টন করা হয়।
সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক দলকে অন্তত ৩.২৫ শতাংশ বৈধ ভোট পেতে হয়। নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি সেই নেতাকে সরকার গঠনের সুযোগ দেন, যাঁর পক্ষে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন জোগাড় করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
২০২৩ সালে হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলা এবং সেই হামলা প্রতিরোধে ইজরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবারের নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিরোধীদের অভিযোগ, হামলার আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে দুর্বলতাগুলি সামনে এসেছিল, সেগুলির জন্য নেতানিয়াহু সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি।
আইজেনকোট-সহ বিরোধী নেতারা একটি স্বাধীন জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারে তাঁর সামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সরকারের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
ইজরায়েলের অতি-রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায় হরেদির ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক পরিষেবা থেকে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একাংশের ইজরায়েলি নাগরিকের বক্তব্য, দেশে ধারাবাহিক সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে সামরিক পরিষেবার দায়িত্ব সমাজের সব শ্রেণির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া উচিত।
নেতানিয়াহুর জোটে হরেদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক দল রয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধীরা সামরিক নিয়োগের নিয়ম পরিবর্তন এবং ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের জন্য চালু থাকা ছাড় তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। নতুন সরকার গঠনের পরেও এই বিষয়টি রাজনৈতিক বিরোধের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
![]()
বিচারব্যবস্থার ভূমিকা এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা এবারের নির্বাচনী প্রচারে আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে। নেতানিয়াহু সরকার এর আগে বিচারব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিল। সেই উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেশে বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছিল।
সরকারের সমর্থকদের বক্তব্য, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, বিরোধীদের আশঙ্কা, এই ধরনের পরিবর্তনে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা প্রভাবিত হতে পারে। ক্ষমতায় এলে বিতর্কিত বিচারবিভাগীয় পরিবর্তনগুলি পর্যালোচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিরোধীরা।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইজরায়েলের বিশেষ কমান্ডো ইউনিট সায়েরেত মাতকালে কাজ করেছেন। তাঁর বড় ভাই ইয়োনাতন নেতানিয়াহু ১৯৭৬ সালে উগান্ডার এনটেবে অভিযানে পণবন্দিদের মুক্ত করার সময় নিহত হন।
অন্যদিকে, গাদি আইজেনকোটের সামরিক জীবনের সূচনা হয় গোলানি ব্রিগেডের মাধ্যমে। তিনি ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইজরায়েলের সেনাপ্রধান ছিলেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজা যুদ্ধের সময় তাঁর ছেলে গাল নিহত হন। পরের দিন যুদ্ধে নিহত হন তাঁর ভাইপো মাওর কোহেন আইজেনকোটও।
দুই নেতার সামরিক অভিজ্ঞতা এবং যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিগত ক্ষতি তাঁদের জনপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
ভোটগ্রহণ শেষ হলে রাজনৈতিক দলগুলির প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদের আসন বণ্টন করা হবে। তবে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবেন না।
কোনও রাজনৈতিক জোট যদি ১২০ সদস্যের সংসদে ৬১ জন সাংসদের সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সরকার গঠনের জন্য একাধিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ভোটদানের উচ্চ হার এবং নির্বাচনের প্রাথমিক প্রবণতা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফিরবেন, নাকি আইজেনকোটের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।








