সঞ্জয় কিশন কৌলের বইয়ে বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে চন্দ্রচূড়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সঞ্জয় কিশন কৌল তাঁর আসন্ন বইয়ে বিচারপতি নিয়োগ, কলেজিয়ামের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সরকারের সঙ্গে আলোচনা এবং বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরেছেন। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ও তাঁর বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সঞ্জয় কিশন কৌল প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত কর্মপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর আসন্ন বই ‘Without Fear or Favour’-এ কলেজিয়ামের বৈঠক এবং বিচারবিভাগ ও সরকারের মধ্যে মতপার্থক্যের বিষয়গুলি উঠে এসেছে। সাংবাদিক করণ থাপরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও কৌল তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তাঁর মন্তব্যগুলি ব্যক্তিগত দাবি, কোনও বিচারবিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত নয়।

কৌলের বক্তব্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতির ছয়টি শূন্যপদ পূরণের জন্য কলেজিয়ামের একটি বৈঠক নির্ধারিত ছিল। পাঁচজন প্রার্থীর নাম নিয়ে আগেই ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বৈঠক শুরু হওয়ার ঠিক আগে চন্দ্রচূড় ষষ্ঠ প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন। কৌল সেই প্রস্তাবে আপত্তি জানান। তাঁর মতে, কলেজিয়ামের অন্য সদস্যদের কাছ থেকে ওই নামের জন্য সম্মতি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না।

কৌলের দাবি, সেই সময় তৎকালীন প্রধান বিচারপতি তাঁকে অন্য একটি ঘরে নিয়ে যান এবং সরকারের মতামত জানার জন্য ফোন করার কথা বলেন। এই পদ্ধতিকে তিনি উপযুক্ত বলে মনে করেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পাঁচটি নাম নিয়োগের জন্য এগিয়ে গেলেও ষষ্ঠ প্রার্থীকে নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়নি। নামগুলি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আগে থেকেই অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল বলে কৌল সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে তিনি এই সন্দেহকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করেননি।

কৌল স্পষ্ট করেছেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনা বা যোগাযোগের বিষয়ে তাঁর আপত্তি নেই। তাঁর উদ্বেগের বিষয় হল, কলেজিয়ামের আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগেই সরকারের সম্মতি নেওয়ার প্রথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে পারে।

তাঁর মতে, সরকারের পরামর্শ নেওয়া এবং আগাম অনুমোদন নিশ্চিত করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই পদ্ধতি নিয়মিত হয়ে উঠলে ভবিষ্যতের প্রধান বিচারপতিদের পক্ষে তা থেকে ভিন্নভাবে কাজ করা কঠিন হতে পারে।

কৌল তাঁর বইয়ে লিখেছেন, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে চন্দ্রচূড়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে আলোচনা বজায় রাখার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও অক্ষুণ্ণ থাকা উচিত।

কৌলের বইয়ে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন (PMLA)-সংক্রান্ত একটি রায়ের পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের সামনে থাকা মামলাটি পরে অন্য একটি বেঞ্চে স্থানান্তর করা হয়।

কৌল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেন, কোনও মামলায় সম্ভাব্য রায় কী হতে পারে, সেই অনুমানের ভিত্তিতে মামলার দায়িত্ব বণ্টন পরিবর্তন করা উচিত নয়।

এ ছাড়া, তিনি কলেজিয়াম ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট যে জাতীয় বিচারবিভাগীয় নিয়োগ কমিশন (NJAC) ব্যবস্থা বাতিল করেছিল, সেই ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনা করা যেত।

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় বলেছেন, বইটি না পড়ে সেখানে উল্লিখিত মন্তব্যগুলির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানানো কঠিন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কলেজিয়ামের বৈঠকে কৌলের সঙ্গে তাঁর আলোচনা সম্মানজনক ছিল এবং সদস্যরা সেখানে খোলাখুলিভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতেন।

চন্দ্রচূড় আরও বলেন, কলেজিয়ামের কোনও বৈঠক ছেড়ে কৌল চলে গিয়েছিলেন, এমন ঘটনা তাঁর মনে পড়ছে না। তাঁর বক্তব্য, কলেজিয়ামের সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলি নথিভুক্ত করা হতো এবং সেখানে কোনও মতবিরোধের উল্লেখ ছিল বলে তাঁর মনে নেই।

বিচারপতি নিয়োগের প্রক্রিয়ায় সরকার ও বিচারবিভাগের মধ্যে আলোচনা হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।কৌলের বইয়ের প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সংবিধান রক্ষার দায়িত্বে থাকা বিচারবিভাগকে ক্ষমতাসীনদের চাপ থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

কৌলের বই প্রকাশের আগে তাঁর বক্তব্য সামনে আসায় কলেজিয়াম ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

 

Leave a comment