উত্তরপ্রদেশের ভোটার তালিকায় একাধিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব। তাঁর দাবি, একই ব্যক্তির নামে বিভিন্ন জেলা ও ভোটকেন্দ্রে একাধিকবার নাম নথিভুক্ত থাকার মতো ঘটনা সামনে এসেছে। এই ধরনের অনিয়ম রুখতে ভোটার তালিকার সঙ্গে আধার সংযুক্ত করা এবং ভোটকেন্দ্রে বায়োমেট্রিক পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। আগামী বছর উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই তাঁর এই দাবি সামনে এসেছে।
সোমবার, ২৬ অক্টোবর, লখনউয়ে সমাজবাদী পার্টির দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় অখিলেশ যাদব নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, দলের পক্ষ থেকে ভোটার তালিকা পরীক্ষা করতে গিয়ে একাধিক অসংগতি নজরে এসেছে। বিভিন্ন জেলা ও ভোটকেন্দ্রের তালিকায় একই ধরনের নাম বারবার দেখা গিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অখিলেশের মতে, বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে একই ব্যক্তির নামে একাধিক জায়গায় ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত থাকার মতো ঘটনা শনাক্ত করা সম্ভব। এই উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনের আধার সংযুক্তিকরণ এবং বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মতো পদ্ধতি বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি জানান। ভোটকেন্দ্রে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় যাচাইয়ের যন্ত্র বসানোরও প্রস্তাব দেন সমাজবাদী পার্টির সভাপতি।
তাঁর দাবি, এই ধরনের যন্ত্রের খরচ খুব বেশি নয় এবং সেগুলি ব্যবহার করলে ভোটার তালিকার ভুল নথিভুক্তি শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভোটার তালিকা তৈরির সময় কোনও যোগ্য ভোটারের নাম যাতে বাদ না পড়ে এবং একই ব্যক্তির নাম যাতে একাধিকবার নথিভুক্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।
ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগের সমর্থনে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেন অখিলেশ যাদব। তাঁর দাবি, সুनीতা নামে ৪২ বছর বয়সি এক মহিলার বিবরণের সঙ্গে মিল রয়েছে, এমন ৪২০টি নথিভুক্তি পাওয়া গিয়েছে। ওই মহিলার স্বামীর নাম রাজেশ বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই নামের ভিত্তিতে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলায় ২,৪০০টিরও বেশি নথিভুক্তি রয়েছে বলেও দাবি করেন অখিলেশ।
এ ছাড়া রাজকুমারী নামে এক মহিলার বিবরণ উল্লেখ করে তিনি জানান, বিভিন্ন জায়গায় অনুসন্ধানের পর ১,৬২৭টি নথিভুক্তির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। বিকাশ যাদব নামেও একাধিক ভোটকেন্দ্রে ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত থাকার অভিযোগ তোলেন তিনি।
তবে সমাজবাদী পার্টির পক্ষ থেকে প্রকাশ করা এই পরিসংখ্যানগুলির স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য এখনও সামনে আসেনি। ভোটার তালিকায় একই নাম একাধিকবার থাকলেই যে সেগুলি একই ব্যক্তির নাম, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিষয়টি যাচাই করতে বয়স, ঠিকানা এবং অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের মিল পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া বা SIR নিয়েও বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন অখিলেশ যাদব। তাঁর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বিষয়টিকে ‘ভোট ফিক্সিং’ বলে উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে ভোটার তালিকার অসংগতি দূর করার দাবি জানান।
অখিলেশের বক্তব্য, বিরোধীদের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ জানানোর পর নির্বাচন কমিশন কয়েকটি বিষয়ের দিকে নজর দিতে শুরু করেছে। তবে এই ধরনের অসংগতি আগে থেকেই শনাক্ত করা হয়নি কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পঞ্চায়েত নির্বাচন প্রসঙ্গেও বক্তব্য রাখেন সমাজবাদী পার্টির সভাপতি। তাঁর মতে, গ্রামের প্রধানরা নিজেদের এলাকার বাসিন্দাদের চেনেন। ফলে স্থানীয় স্তরে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের সময় তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভুল নথিভুক্তি শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় ইচ্ছাকৃত কারচুপির যে অভিযোগ অখিলেশ তুলেছেন, তা তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে সামনে এসেছে। এই অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারি তদন্ত এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
ভারতে ভোটার পরিচয়পত্রের সঙ্গে আধার সংযুক্ত করার ব্যবস্থা আগে থেকেই রয়েছে। তবে এই সংযুক্তিকরণ স্বেচ্ছামূলক। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, ভোটাররা ফর্ম ৬বি-র মাধ্যমে তাঁদের আধার সংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে পারেন। আধার নম্বর না দেওয়ার কারণে কোনও যোগ্য ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায় না।
![]()
আধার পরিচয় যাচাইয়ের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এটি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। ফলে আধার সংযুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক করা এবং বায়োমেট্রিক যাচাই চালু করার মতো প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমান আইনি কাঠামো, তথ্যের সুরক্ষা এবং ভোটারদের সুবিধার বিষয়গুলি বিবেচনা করতে হবে।
লখনউয়ে সাংবাদিক বৈঠকের সময় প্রাক্তন আইএএস আধিকারিক রাম বাহাদুর পাসি এবং দারা সিং প্রজাপতি-সহ একাধিক নেতা সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেন। নতুন সদস্যদের স্বাগত জানিয়ে অখিলেশ যাদব বলেন, তাঁদের যোগদানের ফলে দলের পিডিএ (পিছিয়ে পড়া শ্রেণি, দলিত ও সংখ্যালঘু) রাজনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
তাঁর বক্তব্য, পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক বিস্তার ঘটছে। দারা সিং প্রজাপতির যোগদানের প্রসঙ্গে অখিলেশ আশা প্রকাশ করেন, তাঁর অন্তর্ভুক্তি নির্বাচনে দলকে সুবিধা দিতে পারে।
বাল্মীকি সমাজের কল্যাণের বিষয়েও নিজের দলের পরিকল্পনার কথা জানান অখিলেশ যাদব। তিনি বলেন, সমাজবাদী পার্টি সরকার গঠন করলে প্রতিটি জেলায় মহর্ষি বাল্মীকি জয়ন্তী উপলক্ষে বড় আকারের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
এ ছাড়া বাল্মীকি সমাজের মানুষকে তাঁদের বর্তমান আবাসন কলোনিতে মালিকানার অধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করার আশ্বাস দেন তিনি। তবে উত্তরপ্রদেশের বর্তমান সরকার ২৬ অক্টোবর ২০২৬-এ মহর্ষি বাল্মীকি জয়ন্তী উপলক্ষে সরকারি ছুটি ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে।
এই সাংবাদিক বৈঠকে সমাজবাদী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শিবপাল সিং যাদবও বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি এবং সামাজিক বিভাজন নিয়ে অভিযোগ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, দলে যোগ দেওয়া নেতা ও কর্মীদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হবে।
২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ভোটাররা নির্বাচন কমিশনের সরকারি ওয়েবসাইট voters.eci.gov.in-এ গিয়ে নিজেদের তথ্য এবং ভোটার তালিকায় নামের অবস্থা যাচাই করতে পারেন।













