সোশ্যাল মিডিয়ায় জনবিচার নিয়ে বিতর্ক, কসৌলি ও ধর্মশালার ঘটনা ঘিরে প্রশ্ন

কসৌলি ও ধর্মশালার ঘটনা ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় যাচাইহীন অভিযোগ, ব্যক্তিগত সম্মানহানি, ডিপফেক এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী ঘোষণা করার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লেই অনেক সময় তাঁকে দোষী বলে ধরে নেওয়া হয়। সম্পূর্ণ তথ্য যাচাই না করেই অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে নিশানা করার প্রবণতা ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের উপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। হিমাচল প্রদেশের কসৌলি ও ধর্মশালার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি এই বিতর্ককে সামনে এনেছে।

ইন্টারনেটে কারও ছবি বা ভিডিও প্রকাশ্যে এলেই তা নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য শুরু হয়। কেউ তাঁকে ভুল কাজের জন্য দায়ী করেন, আবার কেউ সম্পূর্ণ তথ্য না জেনেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য শোনার আগেই তাঁকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে ঘটনার অন্য দিক সামনে এলেও ততক্ষণে তাঁর সামাজিক সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে।

হিমাচল প্রদেশের কসৌলি ও ধর্মশালার ঘটনাগুলি এই সমস্যার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কোনও ঘটনার সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ্যে আসার আগে কাউকে দোষী বলে ধরে নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত, সেই প্রশ্নও উঠছে।

হিমাচল প্রদেশের কসৌলিতে ৩১ বছর বয়সি অর্পণ কাটোচের মৃত্যু সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত সম্মানহানির প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। কাংড়া জেলার বাসিন্দা অর্পণ কসৌলির একটি হোটেলে রাঁধুনির কাজ করতেন।

সেনাবাহিনীর পোশাক পরা অবস্থায় তাঁর কয়েকটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে নিজেকে সামরিক আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি পুলিশের কাছেও পৌঁছয়।

পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, তদন্তে কোনও দেশবিরোধী কার্যকলাপে তাঁর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুলিশ তাঁর কাউন্সেলিংও করেছিল।

এরপর অর্পণ বিষাক্ত পদার্থ গ্রহণ করেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বদনাম হওয়ায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তবে তাঁর আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সরকারি স্তরে কোনও নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, ইন্টারনেটে কোনও ব্যক্তিকে ঘিরে তৈরি হওয়া ধারণা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা, প্রকাশ্যে সমালোচনা ও সম্মানহানির প্রভাব সহজে মুছে যায় না।

ধর্মশালার সরকারি কলেজে এক ছাত্রীর মৃত্যুর পরও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্কিত ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর এক সহকারী অধ্যাপক এবং কয়েকজন ছাত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে পুলিশ। শিক্ষা দফতরের প্রাথমিক তদন্তে র‍্যাগিং এবং জাতিগত পরিচয় উল্লেখ করে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগের সমর্থনে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ওই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হয়রানির অভিযোগের তদন্ত সেই সময়ে চলছিল।

এই ঘটনায় অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী ঘোষণা না করার মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের অধিকারকে সম্মান করা প্রয়োজন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় জনবিচার নিয়ে বিতর্ক, কসৌলি ও ধর্মশালার ঘটনা ঘিরে প্রশ্ন

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুল তথ্য ছড়ানোর সমস্যা এখন আর শুধু গুজবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে এমন ছবি, কণ্ঠস্বর ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যা দেখতে বা শুনতে আসলের মতো মনে হতে পারে।

ডিপফেক প্রযুক্তির সাহায্যে কোনও ব্যক্তিকে এমন কথা বলতে দেখা যেতে পারে, যা তিনি বাস্তবে কখনও বলেননি। বিশেষ করে সামরিক আধিকারিক, সরকারি পদে থাকা ব্যক্তি এবং সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে তৈরি ভুয়ো ভিডিও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। যাচাই না করে এ ধরনের বিষয়বস্তু শেয়ার করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষতি হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তও প্রত্যেক নাগরিকের সাংবাদিকের ভূমিকা নেওয়ার ফলে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা সংক্রান্ত শুনানির সময় তাঁর এই মন্তব্য সামনে এসেছিল।

বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যে কেউ নিজের বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। অনেক সময় সাধারণ মানুষের পোস্টের মাধ্যমেই এমন ঘটনা সামনে আসে, যা আগে নজরে পড়েনি। কিন্তু সম্পূর্ণ তথ্য জানার আগেই যখন কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন সমস্যা তৈরি হয়।

কোনও ভিডিওর কয়েক সেকেন্ডের অংশ দেখে সম্পূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। ভিডিওতে ঘটনার একটি অংশমাত্র থাকতে পারে। আবার পুরনো ছবি ও ভিডিওকেও অনেক সময় নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত সত্য সামনে আসার আগেই কোনও ব্যক্তির সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইন্টারনেটে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা সহজ হলেও তার পরিণতি কতটা গুরুতর হতে পারে, তা অনেকেই বিবেচনা করেন না। কোনও পোস্ট সামনে আসার পর অনেকে সত্যতা যাচাই না করেই সেটি শেয়ার করতে শুরু করেন।

বিশেষত গুরুতর কোনও অভিযোগের ক্ষেত্রে পুলিশের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিক্রিয়া এবং ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ সামনে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা জরুরি। নিশ্চিত তথ্য ছাড়া কারও নাম বা ছবি ছড়িয়ে দিলে তাঁর সমস্যার মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত ফোন নম্বর, ঠিকানা বা পরিবারের তথ্য ইন্টারনেটে প্রকাশ করাও অনুচিত। অনলাইনে গালিগালাজ এবং লাগাতার কাউকে নিশানা করার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও অন্যদের প্রশ্ন, অপমান ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হতে পারে।

নিজের মতামত প্রকাশ করা প্রত্যেকের অধিকার। কোনও সিদ্ধান্ত বা ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অন্যায় নয়। তবে প্রশ্ন তোলা এবং কাউকে দোষী ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। মোবাইলে একটি পোস্ট শেয়ার করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলেও, তার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সামাজিক সম্মান পুনরুদ্ধার করতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে।

 

Leave a comment