বাঘের ডেরায় একসময় ঘুরে বেড়াত গন্ডারও! সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস জানলে আজও শিউরে উঠবেন

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সুন্দরবনে একসময় বিচরণ করত জাভা গন্ডারও। গবেষণায় উঠে এল হারিয়ে যাওয়া সেই ইতিহাস, যা আজও শিহরণ জাগায়।

সুন্দরবনের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ভয়ংকর উপস্থিতি। কিন্তু জানেন কি, এই ঘন অরণ্যেই একসময় বিচরণ করত গন্ডারও? নদী, চরভূমি আর নোনা জলের পরিবেশে নিজেদের বদলে নিয়েছিল তারা। ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া সেই জাভা গন্ডারের গল্প আজও শিহরণ জাগায় গবেষকদের মনে।

বাঘের ডেরায় একসময় ঘুরে বেড়াত গন্ডারও! সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস জানলে আজও শিউরে উঠবেন
সুন্দরবনের ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া এক বিরল প্রাণী

গবেষণা ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের জলাভূমি এলাকায় একসময় দেখা মিলত জাভা গন্ডারের। বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম বিপন্ন প্রাণী হিসেবে পরিচিত এই প্রজাতি কয়েক শতাব্দী আগে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্য, নদীপাড় ও কাদামাটির চর— এই প্রতিকূল পরিবেশেই নিজেদের টিকিয়ে রাখতে শিখেছিল তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নোনা জলের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই ছিল এই গন্ডারদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডারের তুলনায় ছিল আলাদা

জাভা গন্ডারের গঠন ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডারের তুলনায় কিছুটা ছোট ছিল। তাদের চামড়া তুলনামূলকভাবে মসৃণ এবং পুরুষ গন্ডারের ছোট শিং থাকত।স্বভাবে ছিল অত্যন্ত লাজুক ও একাকী। বনাঞ্চলের গভীরে পাতা, ডালপালা এবং ফল খেয়েই জীবন কাটাত এই প্রাণীরা। ঘাসে ঢাকা চরভূমি ও নদীর ধারে খাদ্য সংগ্রহে তারা ছিল যথেষ্ট দক্ষ।

বাঘের ডেরায় একসময় ঘুরে বেড়াত গন্ডারও! সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস জানলে আজও শিউরে উঠবেন
নোনা জলের পরিবেশেও বদলে নিয়েছিল নিজেদের

সুন্দরবন বিষয়ক গবেষক Dr. Animesh Mondal-এর মতে, সুন্দরবনের জাভা গন্ডার ছিল পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত এক বিশেষ প্রজাতি।ঘন বন, নদীপাড় ও জলাভূমিতে চলাফেরার জন্য তারা নিজেদের শারীরিক গঠন ও আচরণে পরিবর্তন এনেছিল। দুই ২৪ পরগনার নিম্নাঞ্চলের চরভূমিতে একসময় এই গন্ডারদের দেখা পাওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন গবেষকরা।

মানুষের হস্তক্ষেপেই হারিয়ে যায় গন্ডার

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বনভূমি ধ্বংস, কৃষিজমি সম্প্রসারণ, নদীভাঙন এবং নির্বিচারে শিকারের কারণে দ্রুত কমতে থাকে গন্ডারের সংখ্যা।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার জেরেই সুন্দরবন থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় এই বিরল প্রাণী। বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব শুধু ইতিহাস আর গবেষণার পাতাতেই সীমাবদ্ধ।

বাঘের ডেরায় একসময় ঘুরে বেড়াত গন্ডারও! সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস জানলে আজও শিউরে উঠবেন
‘বেগম’ নামের সেই গন্ডারের গল্প আজও আলোচনায়

সুন্দরবনের ইতিহাসে ‘বেগম’ নামে এক স্ত্রী গন্ডারের উল্লেখ আজও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৭২ সালে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে তাকে সংগ্রহ করে লন্ডনের চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।সেখানে প্রায় ২৮ বছর বেঁচে ছিল এই গন্ডারটি। গবেষকদের মতে, ‘বেগম’-এর শারীরিক গঠন ও আচরণ নিয়ে এখনও গবেষণা চলে। তার সংরক্ষিত নথিপত্র সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া গন্ডার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।

শুধু বাঘ নয়, বহু বিরল প্রাণীর আশ্রয় ছিল সুন্দরবন

আজ সুন্দরবন মূলত বাঘের আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত হলেও একসময় এটি ছিল বহু বিরল প্রাণীর নিরাপদ ঠিকানা। জাভা গন্ডারের ইতিহাস সেই বিস্মৃত অধ্যায়েরই স্মারক।গবেষকদের মতে, এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়— প্রকৃতিকে বাঁচতে দিলে সে নিজেই নিজের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।

বাঘের ডেরায় একসময় ঘুরে বেড়াত গন্ডারও! সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস জানলে আজও শিউরে উঠবেন
আজকের সুন্দরবন মানেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের রাজত্ব। কিন্তু ইতিহাস বলছে, একসময় এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যেই বাস করত বিরল জাভা গন্ডার। নোনা জল, কাদামাটি আর চরভূমির পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছিল তারা। গবেষকদের মতে, মানুষের হস্তক্ষেপ, বনভূমি ধ্বংস এবং শিকারের জেরেই সুন্দরবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যায় এই বিরল প্রাণী।

Leave a comment