যুক্তরাষ্ট্র-ইরান প্রাথমিক শান্তি চুক্তিতে ডিজিটাল স্বাক্ষর, জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা

প্রতিবেদটাল স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে। ১৯ জুন জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। চুক্তিতে পারমাণবিক তদারকি, নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত বিষয় এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তি প্রস্তুত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের মতে, চুক্তিটির ওপর ইতোমধ্যে ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে এবং ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চুক্তিটি প্রায় সম্পন্ন এবং শিগগিরই তা প্রকাশ করা হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এটি সীমিত পরিসরের একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (MoU), যার ভিত্তিতে পরবর্তী পর্যায়ে কারিগরি আলোচনা চলবে।

নিউইয়র্ক টাইমসসহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিটির প্রাথমিক ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও যুক্ত ছিলেন।

তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, সব বিবরণ চূড়ান্ত হওয়ার পরই নথিটি প্রকাশ করা হবে।

১৯ জুন জেনেভায় সম্ভাব্য আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানকে এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে চুক্তিটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। এতে নিরাপত্তা, পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সহায়তা-সংক্রান্ত একাধিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে এটি একটি প্রাথমিক খসড়া মাত্র। উভয় দেশের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত থাকবে, যেখানে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং পরিদর্শন ব্যবস্থার মতো বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক সহায়তা ও জব্দকৃত তহবিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে ইরান প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি প্যাকেজ পেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ এসব দাবি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরান চুক্তির সব শর্ত পূরণ করলেই কেবল অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ইরানের গণমাধ্যম দাবি করেছে যে জব্দকৃত তহবিলের একটি অংশ অবিলম্বে মুক্ত করা হতে পারে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই তথ্যকে ভুল ও বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করেছে।

চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরিদর্শনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনের মতে, ইরানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর পরিদর্শকদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে সম্মতি হয়েছে। IAEA পরিদর্শকরা নিশ্চিত করবেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তা অস্ত্র উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে না। চুক্তিতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদকে কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় রাখা প্রয়োজন, যাতে তা অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার না হয়।

অন্যদিকে, ইসরায়েল চুক্তি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। দেশটির নেতৃত্বের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তি তাদের জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগকে পুরোপুরি সমাধান করে না। বিপরীতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কুয়েতসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং এটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান চুক্তিটিকে “বিজয়ের দলিল” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি প্রমাণ করে যে আলোচনার সময় ইরান শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছিল। ইরান আরও দাবি করেছে যে চুক্তিটি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাবে এবং দেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও মতপার্থক্য রয়েছে। কিছু শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করেন, ইরান চুক্তির সব শর্ত মানবে কি না তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে, প্রশাসনের কিছু নেতা বলেছেন, এই চুক্তি অঞ্চলে সংঘাত এড়ানোর একটি সুযোগ হতে পারে। এসব মতপার্থক্য সত্ত্বেও হোয়াইট হাউস আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

সম্ভাব্য চুক্তির প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও দেখা যাচ্ছে। অপরিশোধিত তেলের দামে পতন রেকর্ড করা হয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে নড়াচড়া সৃষ্টি হয়েছে।

ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। তেলের দাম কমলে আমদানি ব্যয় হ্রাস, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার হওয়ার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় এসেছে।

এছাড়া মুদ্রাবাজারেও প্রভাব দেখা গেছে এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে একাধিক মুদ্রার মানোন্নয়নের খবর পাওয়া গেছে।

Leave a comment