যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের ইরাকে যৌথ বিমান হামলার পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা সতর্কতা বৃদ্ধি

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ বিমান হামলা, ইরানের পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি, হরমুজ প্রণালী ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য এবং তেল সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্য নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের তথ্য এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া ঘাঁটিগুলোতে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে। এই ঘটনাপ্রবাহের পর ইরাক, জর্ডান, সৌদি আরব এবং হরমুজ প্রণালীসহ গোটা অঞ্চলে উত্তেজনা ও নিরাপত্তা সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে তেল সরবরাহ, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগও বেড়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বাহিনী পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর একাধিক ঘাঁটিতে নির্ভুল বিমান হামলা চালায়। মার্কিন পক্ষের দাবি, এসব ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, গত ৭২ ঘণ্টায় অঞ্চলে সংঘটিত একাধিক ড্রোন হামলার জবাবে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তাদের দাবি, হামলায় অস্ত্রভাণ্ডার, লজিস্টিকস কেন্দ্র এবং পরিচালন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করে, তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড-সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর দিকে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর দাবি, নিক্ষিপ্ত সব ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রতিহত করা হয়েছে এবং কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে ইরানি পক্ষ জানিয়েছে, এটি মার্কিন সামরিক অভিযানের জবাব এবং হামলা অব্যাহত থাকলে তাদের প্রতিক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে।

ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স (PMF) দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের হামলায় তাদের একাধিক সদর দপ্তর লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, নিনেভেহ প্রদেশে হামলায় আট যোদ্ধা নিহত এবং আরও চারজন আহত হয়েছেন।

PMF এসব হামলাকে ইরাকের সার্বভৌমত্ব এবং দেশটির আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে এবং একে “বিপজ্জনক উসকানি” হিসেবে অভিহিত করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এখনও চলছে।

ইরাকের সরকারি সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বসরায় PMF-এর সদর দপ্তরে বিমান হামলায় দুই সদস্য আহত হয়েছেন। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ঘটনাটি তদন্ত করছে।

উত্তেজনার মধ্যে IRGC দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালীতে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার আটক করেছে। ইরানি পক্ষের দাবি, সতর্কতা সত্ত্বেও জাহাজগুলো কথিতভাবে অনিরাপদ নৌপথ ব্যবহার অব্যাহত রেখেছিল।

IRGC আরও সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনা অনুসরণকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই বক্তব্য বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ।

সৌদি আরব জানিয়েছে, তাদের পূর্বাঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনার দিকে অগ্রসর হওয়া একাধিক ড্রোন দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দাবি করেছে, তারা লোহিত সাগরে একটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাও লোহিত সাগরে একটি ট্যাংকারের কাছে বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। তবে ঘটনাটির স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ এখনও হয়নি।

হোয়াইট হাউসে বৈঠকের পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। দুই নেতা একমত হন যে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক যোগাযোগের খবরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে কিছুটা নরম প্রবণতা দেখা গেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বা লোহিত সাগরে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে এবং তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরাক, জর্ডান এবং সৌদি আরবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একাধিক ঘটনার দায় হুতি বিদ্রোহীরা স্বীকার করেছে, যদিও কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে হামলাকারীদের পরিচয় এখনও স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক অভিযান ও পাল্টা হামলা একইভাবে অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক শক্তিগুলো উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা জোরদার করতে পারে।

 

Leave a comment