যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে, যার পর মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালী এলাকায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পরিচালনাগত প্রভাব দুর্বল করা।
CENTCOM-এর তথ্য অনুযায়ী, বুশেহর, চাবাহার, বান্দার আব্বাস, সিরিক এবং কোনারকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সাম্প্রতিক অভিযানে ইরানের প্রায় ৯০টি সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ড্রোন সংরক্ষণাগার, নৌঘাঁটি, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং সামরিক লজিস্টিকস স্থাপনা।
CENTCOM জানিয়েছে, হরমুজ অঞ্চলে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এই অভিযানের উদ্দেশ্য। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান-সমর্থিত কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলেছে।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আবার হামলা হলে তার জবাব “২০ গুণ বেশি শক্তি” দিয়ে দেওয়া হবে।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান যোগাযোগ করে সমঝোতার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। তবে তিনি দাবি করেন, তেহরান কোনো চুক্তি আন্তরিকভাবে মেনে চলবে বলে তাঁর বিশ্বাস নেই। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা এবং মিত্র দেশগুলোর সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে হামলা হলে তার জবাব আগের তুলনায় আরও কঠোর হবে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের দাবি, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের জবাব দেওয়া।
তবে বাহরাইন ও কুয়েতের কর্মকর্তারা শুধু এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সক্রিয় করা এবং সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দুই দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার পেছনে কারা ছিল বা এতে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৮.৮০ মার্কিন ডলার এবং ডব্লিউটিআই (WTI) ক্রুডের দাম প্রায় ৭৪.২৬ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
![]()
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা আরও বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে, যার ফলে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। এই এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকার তাদের নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর বাহরাইনে এয়ার রেইড সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশ তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছে।
বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিটের সদর দপ্তর অবস্থিত। সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কুয়েতেও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সক্রিয় করা হয়েছে।
ইরান একটি ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর সরকারি কমপ্লেক্সের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ সম্ভব হয়নি।
ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, এসব হামলার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতীকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতসহ একাধিক দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদার জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালীতে চলাচল ব্যাহত হলে তেল আমদানি, শিপিং ব্যয় এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ধারাবাহিক সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য ও পাল্টা পদক্ষেপের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।









