মার্কিন সিনেটে ৫০-৪৮ ভোটে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব পাস

পদক্ষেপ বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে মার্কো রুবিওর বৈঠক, পারমাণবিক পরিদর্শন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং তেলবাজারের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই মার্কিন সিনেট ৫০-৪৮ ভোটে একটি প্রস্তাব পাস করেছে, যাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং ইরান নীতি নিয়ে কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে মতপার্থক্য অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে।

এর আগে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদও অনুরূপ একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল। ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্টের পর এটিই প্রথম ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যখন মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ কোনো প্রেসিডেন্টকে সামরিক অভিযান সমাপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস এই প্রস্তাবকে প্রতীকী বলে উল্লেখ করে জানিয়েছে, এর কোনো আইনি প্রভাব থাকবে না, কারণ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

সিনেটে ভোটাভুটির সময় চারজন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান নীতি নিয়ে তাঁর নিজ দলেই ক্রমবর্ধমান মতভেদের ইঙ্গিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো বিষয়গুলোতে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ভিন্নমত প্রকাশ পেয়েছে এবং এই ভোটাভুটি সেই প্রবণতারই প্রতিফলন।

প্রস্তাব পাস হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, এমন সময় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যখন ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তির দিকে এগোচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মার্কিন শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে এবং এই সময়ে কংগ্রেসের এই পদক্ষেপ কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারে।

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েত সফর করছেন। তাঁর সফরের মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ দূর করা বলে জানানো হয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর আশঙ্কা, নতুন কোনো চুক্তি হলে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাব বাড়তে পারে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পর্কে স্পষ্ট বিধান না থাকায় আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ওয়াশিংটন এসব দেশকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান আলোচনায় ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য একটি তহবিল নিয়েও আলোচনা হচ্ছে বলে খবর রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই পরিকল্পনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা চাওয়া হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন কোনো অর্থনৈতিক প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে তা ইরানের অর্থনীতিকে স্বস্তি দিতে পারে। তবে এর জন্য আঞ্চলিক দেশগুলো ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য প্রয়োজন হবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক দিনের সফরে পাকিস্তানে পৌঁছেছেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা এবং সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন।

মার্কিন সিনেটে ৫০-৪৮ ভোটে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব পাস

এ সময় তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনো চুক্তির অংশ নয় এবং ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হবে না। পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বাইরের কোনো চাপের মুখে তা সীমিত করা হবে না।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের অনুমতি না দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা প্রক্রিয়া থেকে সরে যেতে পারে। ট্রাম্পের মতে, ইরান ইতোমধ্যেই এই শর্ত মেনে নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের উপযুক্ত সময়ে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।

তবে পরিদর্শন কখন শুরু হবে এবং এর প্রক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তা সত্ত্বেও বিষয়টি দুই দেশের আলোচনার অন্যতম সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।

ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার আহমদ রেজা পুরদাস্তান দাবি করেছেন, দেশটি আর শুধু প্রতিরক্ষামূলক নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজন হলে ইরান আগাম হামলার কৌশলও গ্রহণ করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানি সামরিক বাহিনীর বহু সক্ষমতা এখনো ব্যবহার করা হয়নি এবং সম্ভাব্য যে কোনো হুমকির জবাব দিতে দেশ প্রস্তুত রয়েছে।

১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া চুক্তির পর হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১১টি জাহাজ নিরাপদে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অতিক্রম করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়াও নিশ্চিত করেছে যে তাদের চারটি জাহাজ নিরাপদে হরমুজ অঞ্চল ত্যাগ করেছে। তবে এখনো বহু আন্তর্জাতিক জাহাজ ওই এলাকায় অবস্থান করছে এবং পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনার প্রভাব বৈশ্বিক তেলবাজারেও দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ০.৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৬.৭১ ডলারে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর নিম্নস্তর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা এবং তেল সরবরাহ ব্যাহত না হওয়ার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কমিয়েছে। এর ফলে জ্বালানি বাজারে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা আগামী মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তিকে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরান তার নিরাপত্তা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো আপসের ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

 

Leave a comment