যুক্তরাষ্ট্রের ইরান হামলার জবাবে জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি ইরানের

ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান। হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর তথ্য জানিয়েছে। এর জবাবে ইরান জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও তীব্র হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনায় নতুন দফায় হামলা চালানোর তথ্য দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, হামলায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার নেটওয়ার্ক, সামুদ্রিক স্থাপনা, যোগাযোগ কেন্দ্র এবং মাইন পাতা-সংক্রান্ত সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, ইরানের যেসব সক্ষমতাকে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক চলাচলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে, সেগুলো দুর্বল করাই সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে দুই দেশের উত্তেজনা দ্রুত বেড়েছে। এই জলপথ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন হামলার জবাবে ইরান জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার সময় বিপুল সংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার দাবিও করেছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী জর্ডানে হামলায় কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।

কুয়েতেও ইরানি ড্রোন হামলার খবরের পর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। অন্যদিকে, জর্ডান দাবি করেছে, তাদের সেনাবাহিনী ইরানের দিক থেকে ছোড়া ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এসব ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে তাৎক্ষণিক কোনো সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা নাকচ করেছেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং ইরানের অর্থনীতি গুরুতর চাপের মধ্যে রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ওয়াশিংটনের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে।

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ বর্তমান সংকটের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান এই সামুদ্রিক পথের আশপাশে মাইন পাতা শুরু করার চেষ্টা করেছে। এমন পরিস্থিতিতে তেল ও গ্যাস পরিবহনকারী জাহাজের চলাচল ব্যাহত হতে পারে।

ইরান দাবি করেছে, খুজেস্তান প্রদেশে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাতজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা IRNA-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রদেশটির তিনটি স্থানে হামলা চালিয়েছে।

এই দাবির স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিক নিশ্চিতকরণ সম্ভব হয়নি। চলমান সামরিক অভিযান এবং স্বাধীনভাবে প্রবেশের সীমাবদ্ধতার কারণে সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে নিহত ও আহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়া ইরানকে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে এই কথিত গোপন কর্মসূচি ২০২৩ সাল থেকে চলছে এবং এর উদ্দেশ্য ইরানের দীর্ঘপাল্লার উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা শক্তিশালী করা।

প্রতিবেদনটিতে কথিত কর্মসূচির কোডনেম C430L বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, রাশিয়া ইরানকে র‍্যামজেট প্রপালশন ব্যবস্থা উন্নয়নে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।

র‍্যামজেট প্রযুক্তি এমন ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেগুলো বেশি গতিতে উড়তে সক্ষম। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান র‍্যামজেট ব্যবস্থা তৈরি করে তার ফ্লাইট পরীক্ষাও করেছে। তবে রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি কোনো সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইরান সক্রিয়ভাবে মোতায়েন করেছে—এমন স্বাধীন প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইরান হামলার জবাবে জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি ইরানের

ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সিরিকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার অভিযোগও করেছে। ইরানের সরকারি টেলিভিশন IRIB-এর তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় চারজন নিহত এবং প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেছেন, সিরিকের কুহস্তাক এলাকায় একটি আবাসিক বাড়িতে হামলা চালানো হয়, যেখানে একটি পরিবার বিয়ের অনুষ্ঠান করছিল। তাঁর দাবি, হামলায় ৫০ জনের বেশি পুরুষ, নারী ও শিশু নিহত বা আহত হয়েছেন।

ইরানি পক্ষ মার্কিন এই অভিযানকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন নিশ্চিতকরণ হয়নি এবং এই ঘটনার বিষয়ে মার্কিন পক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে পৃথক দাবিগুলোর যাচাই প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমান উত্তেজনার নতুন পর্ব শুরু হয় রবিবার, ৩০ আগস্ট। মার্কিন সেনাবাহিনী জানায়, তারা ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি রকেট লঞ্চারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, ওই সামরিক সক্ষমতাগুলো অঞ্চলটির জন্য হুমকি তৈরি করছিল।

ইরানও ওই অভিযানে মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার দাবি করেছিল। তবে সে সময় নিহত ও আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

এরপর দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। এখন জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ইরানি দাবির ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই জলপথে সামরিক বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বা সামুদ্রিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়লে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহ প্রভাবিত হতে পারে। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় সম্ভাব্য ইরানি হামলা এবং ইরানের সামরিক অবকাঠামোয় মার্কিন অভিযানের ফলে অঞ্চলটির পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আগামী দিনে দুই দেশ সামরিক অভিযান আরও বাড়ায় নাকি কূটনৈতিক পথে ফিরে যায়, তা নিয়ে নজর রয়েছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালী, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের দিকে আন্তর্জাতিক নজর রয়েছে।

 

Leave a comment