উত্তরাখণ্ডে টানা ভারী বৃষ্টিতে পাহাড় থেকে সমতল—সব এলাকাতেই জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় নদী ও নালা ফুলে উঠেছে, জল জমা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। বৃষ্টিজনিত পৃথক দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসের কারণে রাজ্যে ১৭২টি রাস্তা বন্ধ রয়েছে। উত্তরকাশীতে ভূমিধসের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। দেরাদুনে তীব্র জলের স্রোতে দুই শিশু ভেসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
টানা বৃষ্টির কারণে পার্বত্য জেলাগুলিতে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাহাড় থেকে মাটি ও পাথর পড়ায় একাধিক রাস্তা বন্ধ হয়েছে। লোক নির্মাণ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাগুলি বন্ধ রাস্তা খোলার কাজ করছে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় উদ্ধার ও রাস্তা পুনরুদ্ধারের কাজে সমস্যা হচ্ছে। কোথাও রাস্তা খোলার পর ফের মাটি এসে পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
উত্তরকাশীতে বৃষ্টির কারণে একাধিক সংবেদনশীল এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়েছে। পাহাড়ের ঢাল থেকে লাগাতার পাথর ও মাটি পড়ায় গাড়িচালকদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। প্রশাসন মানুষকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়াতে এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করে পাহাড়ি রাস্তায় চলাচলের পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষভাবে নদী ও বর্ষার নালার আশপাশে না যাওয়ার জন্য যাত্রীদের বলা হয়েছে।
রাজ্যে বন্ধ থাকা ১৭২টি রাস্তার মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পথও রয়েছে। বিভিন্ন জেলায় রাস্তা বন্ধ থাকায় গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং স্বাস্থ্য পরিষেবায় পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। কিছু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় মানুষকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। প্রশাসনের দলগুলি যন্ত্রের সাহায্যে মাটি সরিয়ে রাস্তা খোলার চেষ্টা করছে।
রাজধানী দেরাদুনেও বৃষ্টির প্রভাব দেখা দিয়েছে। একাধিক এলাকায় বর্ষার নালা ও ছোট নদীতে তীব্র স্রোত বইছে। এর মধ্যেই দুই শিশু তীব্র জলের স্রোতে ভেসে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একটি শিশুর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্য শিশুটির সন্ধানে উদ্ধারকারী দল অভিযান চালাচ্ছে। হঠাৎ জলের স্রোত বেড়ে যাওয়ায় পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
ভারী বৃষ্টির পর দেরাদুনের একাধিক নিচু এলাকায় জল জমেছে। রাস্তা জলে ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং মানুষকে বাড়ি ও গাড়ি নিরাপদ রাখতে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বর্ষার জল এত দ্রুত রাস্তায় এসেছে যে মানুষকে সামলানোর সুযোগও মেলেনি। প্রশাসন ও দুর্যোগ মোকাবিলা দলগুলির কাছে একাধিক স্থান থেকে সাহায্যের জন্য খবর এসেছে।
বৃষ্টির সময় দেরাদুনের কয়েকটি এলাকায় গাড়ি ভেসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তীব্র স্রোতে গাড়ি আটকে যাওয়ার পর SDRF এবং পুলিশের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে মানুষকে নিরাপদে বের করে আনার চেষ্টা করেছে। একটি ঘটনায় গাড়িতে থাকা কয়েকজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদের সন্ধান ও ত্রাণকাজ চলতে থাকে। লাগাতার বৃষ্টির কারণে নদী ও নালার জলস্তর দ্রুত বাড়ছে, ফলে বিপদও বাড়ছে।
বৃষ্টির পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজ্যের পাঁচ জেলায় স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির সময় রাস্তায় জল জমা, ভূমিধস এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিভাবকদেরও শিশুদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে না পাঠানোর আবেদন জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া দফতর রাজ্যের বিভিন্ন অংশে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা জানিয়েছে। কয়েকটি জেলার জন্য অরেঞ্জ অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে এবং অন্যান্য এলাকাতেও ভারী বৃষ্টির সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া দফতরের মতে, পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টির সময় ভূমিধস এবং হঠাৎ বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। মানুষকে নদী, নালা ও গদেরা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উত্তরাখণ্ডে বৃষ্টির সময় সবচেয়ে বড় বিপদের মধ্যে রয়েছে হঠাৎ জলস্তর বেড়ে যাওয়া। পাহাড়ে কিছু সময় বৃষ্টি না হলেও উচ্চতর এলাকায় হওয়া বৃষ্টির জল নিচে নেমে নদী ও নালার জলস্তর হঠাৎ বাড়িয়ে দিতে পারে। এই কারণে প্রশাসন মানুষকে নদীর ধারে যাওয়া এবং তীব্র স্রোতের রাস্তা পার হওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করছে।
নৈনিতাল, পিথোরাগড়, চামোলি, রুদ্রপ্রয়াগ, টেহরি এবং বাগেশ্বরসহ একাধিক জেলায় বৃষ্টির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানীয় জল সরবরাহও প্রভাবিত হয়েছে। গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নৈনিতালে টানা বৃষ্টির কারণে হ্রদের জলস্তরও বেড়েছে। হ্রদের জল নির্ধারিত স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর অতিরিক্ত জল নিষ্কাশনের জন্য চ্যানেল খোলা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আশপাশের এলাকায় প্রশাসন সতর্কতা বাড়িয়েছে। হ্রদ ও সংলগ্ন নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে জলস্তরের দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে।
পার্বত্য এলাকায় বৃষ্টির সঙ্গে ভূমিধসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। রাস্তার পাশে পাহাড় থেকে পাথর পড়ার ঘটনা লাগাতার ঘটছে। অনেক সময় গাড়িচালকরা মাটির ধসের কবলে পড়ছেন। প্রশাসন মানুষকে জানিয়েছে, কোনও রাস্তায় ভূমিধস বা পাথর পড়ার খবর পাওয়া গেলে সেই পথে যাতায়াত এড়াতে হবে।
রাজ্যে বৃষ্টিজনিত মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনের উদ্বেগ বেড়েছে। পৃথক ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য ত্রাণ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের দলগুলি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। যেখানে প্রয়োজন হচ্ছে, সেখানে ত্রাণসামগ্রী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বন্ধ রাস্তা খুলে দেওয়াও প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাগাতার বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের ঢালে মাটি ও পাথর সরে যাওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। যন্ত্রের সাহায্যে মাটি সরানো হচ্ছে। তবে একাধিক সংবেদনশীল এলাকায় কাজ করা কর্মীদের নিরাপত্তাও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। রাস্তা খোলার আগে উপর থেকে ফের মাটি পড়ার আশঙ্কা নেই, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দেরাদুনে শিশুদের ভেসে যাওয়ার ঘটনার পর প্রশাসন বর্ষার নালা ও জল জমা এলাকাগুলির বিষয়ে মানুষকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। বৃষ্টির সময় অনেক ছোট নালা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফুলে উঠতে পারে। এই ধরনের স্থান পার হওয়ার চেষ্টা করা বিপজ্জনক হতে পারে। অভিভাবকদেরও শিশুদের এই ধরনের এলাকা থেকে দূরে রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।
এই মুহূর্তে উত্তরাখণ্ডে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে এবং আগামী সময়েও একাধিক এলাকায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ১২টি মৃত্যু, ১৭২টি বন্ধ রাস্তা, উত্তরকাশীতে ভূমিধস, দেরাদুনে দুই শিশুর ভেসে যাওয়ার ঘটনা এবং পাঁচ জেলায় স্কুল বন্ধ থাকার পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও SDRF-এর দলগুলি ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষকে আবহাওয়া পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত নদী-নালা, পাহাড়ের ঢাল এবং সংবেদনশীল রাস্তা থেকে দূরে থাকার আবেদন জানানো হয়েছে।











