তেল-প্রতিরক্ষা-কূটনীতি: কোন লক্ষ্য নিয়ে ভারতে এলেন ভ্লাদিমির পুতিন?

ভারতে এলেন ভ্লাদিমির পুতিন। মোদীর সঙ্গে বৈঠকে তেল-বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা চুক্তি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি মূল আলোচ্য। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় দিল্লিতে পৌঁছোন : ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবার ভারত সফরে এলেন। রাতেই তিনি যান প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে; পরদিন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও হায়দরাবাদ হাউসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে যোগ দেবেন। মূল আলোচ্য তিনটি ক্ষেত্র—বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, তেল আমদানি সংকট, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিলম্ব, এবং এশীয় ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ—সব মিলিয়ে পুতিনের এই সফর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তেল-প্রতিরক্ষা-কূটনীতি: কোন লক্ষ্য নিয়ে ভারতে এলেন ভ্লাদিমির পুতিন?

বাণিজ্যে নতুন দিশা: তেল ও বাণিজ্য ঘাটতি বড় ইস্যু

২০২০ সালে ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলার। পাঁচ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮.৭২ বিলিয়নে—যার বেশির ভাগই রাশিয়ার সস্তা ক্রুড অয়েল আমদানির ফল।রাশিয়ার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মার্চের মধ্যে এই অঙ্ক ১০০ বিলিয়নে তোলা।কিন্তু সমস্যা রয়েছে—ভারতের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি।ভারত রাশিয়ায় মাত্র ৪.৮৮ বিলিয়ন ডলার রফতানি করে, বদলে আমদানিতেই খরচ হয় ৬৩.৮৪ বিলিয়ন ডলার। মোবাইল ফোন, চিংড়ি, মাংস ও পোশাক—এই কয়েকটি সেক্টর ছাড়া রাশিয়ার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপস্থিতি কম।এর মধ্যেই আমেরিকা ভারতের উপর ৫০% কর বসিয়েছে, যার ফলে ভারতীয় সংস্থাগুলির রুশ তেল আমদানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই তেল আমদানি চালু রাখার পথ কীভাবে সহজ করা যায়—এই বিষয়টি আলোচনার মূল কেন্দ্র হতে চলেছে।

প্রতিরক্ষায় বার্তা: S-400 বিলম্ব থেকে ‘পঞ্চম প্রজন্ম’ যুদ্ধবিমান

২০১৮ সালের S-400 চুক্তি অনুযায়ী মোট ৫টি স্কোয়াড্রন ভারতের হাতে দেওয়ার কথা রাশিয়ার। কিন্তু যুদ্ধকালীন চাপের কারণে এখনো পর্যন্ত মাত্র ৩টি স্কোয়াড্রন এসেছে।

আগের ২টি স্কোয়াড্রনের দ্রুত ডেলিভারি—এই দাবিই নয়া দিল্লির প্রধান আলোচ্য।

এছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু—

 পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট আলোচনা

রাশিয়ার মতে, সুখোই Su-57 ভারতকে দেওয়া হলে তা হবে অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী স্টিলথ ফাইটার।

ভারত ইতিমধ্যেই নতুন যুদ্ধবিমান খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু করেছে—রাফাল M, F-21, সুপার হর্নেট, টাইফুন—সবই তালিকায় রয়েছে।

রাশিয়া চাইছে এই প্রতিযোগিতায় Su-57-কে ভারতের সামনে বড় বিকল্প হিসেবে তুলতে।

কেন ভারত হঠাৎ পঞ্চম প্রজন্মের জেট চায়?

সূত্র বলছে—পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে ৪০টি J-35 কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষায় এগিয়ে থাকতে ভারতও প্রস্তুত হতে চাইছে।

তেল-প্রতিরক্ষা-কূটনীতি: কোন লক্ষ্য নিয়ে ভারতে এলেন ভ্লাদিমির পুতিন?

কূটনীতি: মার্কিন চাপের মাঝে রাশিয়ার বার্তা ‘ভারত আমাদের পাশে’

পুতিনের এই সফরের কূটনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

কারণ—

আমেরিকা ইতিমধ্যেই ভারতের উপর কঠোর কর বসিয়েছে

ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোণঠাসা

রাশিয়া চাইছে ভারতকে মধ্যস্থতার ভূমিকায় আনতে

গ্লোবাল সাউথে ভারতকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর কৌশলগত জোট গড়তে আগ্রহী পুতিন

চিন সফরে পুতিন–শি জিনপিং জুটি যতটা ঘনিষ্ঠতা দেখিয়েছে, সেই জায়গায় ভারতকে পাশে পাওয়া রাশিয়ার কাছে কৌশলগতভাবে বিশেষ লাভজনক।

ইউক্রেন যুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্ব যখন একজোট, তখন ভারতের নিরপেক্ষ অবস্থান রাশিয়ার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষণ: কেন এই সফর বিশ্ব রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ

এশিয়ার শক্তি-সমীকরণে নতুন ত্রিভুজ—ভারত–রাশিয়া–চিনমধ্যপ্রাচ্য, গ্লোবাল সাউথ ও ব্রিকস–এ ভারতের প্রভাব বাড়ছেরাশিয়া ভারতের মাধ্যমে আগ্রাসী পশ্চিমা চাপ সরাতে চাইছেভারতের দৃষ্টিতে—রাশিয়া এখনও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা সঙ্গীএই কারণে পুতিনের সফরকে শুধু বাণিজ্য বা প্রতিরক্ষা বৈঠক বলা যাবে না—এটি আসলে বৃহত্তর ভূরাজনীতির নতুন অধ্যায়।

তেল-প্রতিরক্ষা-কূটনীতি: কোন লক্ষ্য নিয়ে ভারতে এলেন ভ্লাদিমির পুতিন?

ইউক্রেন যুদ্ধের পর প্রথমবার ভারতে এলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সামঞ্জস্য—এই তিন বড় ইস্যু নিয়েই মোদী–পুতিন বৈঠক হবে বলে কূটনৈতিক সূত্রের খবর। রাশিয়া-ভারত সম্পর্কের নতুন দিশা নির্ধারণে এই সফর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a comment