অযোধ্যায় আয়োজিত দশম দীপোৎসবকে বিশেষ ও ঐতিহাসিক করে তুলতে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। এবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন দেশের উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণন। রাম মন্দিরে প্রথম প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে তিনি দীপোৎসবের সূচনা করবেন। উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে এটিই তাঁর প্রথম অযোধ্যা সফর। পাশাপাশি, দীপোৎসবে অংশগ্রহণকারী দেশের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন তিনি। এবারের অনুষ্ঠানে রামনগরীর ৫৬টি ঘাটে ৩০ লক্ষ প্রদীপ জ্বালানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও শহরের গুরুত্বপূর্ণ মন্দির, মঠ, কুণ্ড এবং বিভিন্ন জনসাধারণের স্থানে প্রদীপ প্রজ্বলনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অযোধ্যার দীপোৎসবের সূচনা থেকেই ভগবান শ্রীরামের নগরীকে প্রদীপের আলোয় সাজানোর প্রথা চলে আসছে। এখনও পর্যন্ত দীপোৎসবের উদ্বোধন উপলক্ষে রাম মন্দিরে প্রথম প্রদীপ প্রজ্বলন করে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তবে এবার সেই সুযোগ পেতে চলেছেন উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণন। তাঁর হাতে প্রথম প্রদীপ প্রজ্বলনের পর রামনগরীতে দীপোৎসবের মূল অনুষ্ঠান এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি, তিনি রামলালার দর্শনও করবেন। এর আগে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় রাম মন্দিরে দর্শন করেছিলেন।
এবারের দীপোৎসবের মূল আকর্ষণ হতে চলেছে রাম কি পৈড়ি এবং সরযূ নদীর তীরে অবস্থিত ৫৬টি ঘাট। এই ঘাটগুলিতে প্রায় ৩০ লক্ষ প্রদীপ সাজানোর কাজ চলছে। একসঙ্গে প্রদীপ প্রজ্বলনের সুবিধার জন্য নির্ধারিত ব্লক ও সারি অনুযায়ী সেগুলি সাজানো হচ্ছে। এই কাজের জন্য ঘাটগুলির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং চিহ্নিতকরণের কাজ আগেই শুরু হয়েছে।
অনুষ্ঠান সফল করতে ড. রামমনোহর লোহিয়া অবধ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির ছাত্রছাত্রীদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে।
প্রদীপ সাজানো এবং জ্বালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে। তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ডিগ্রি কলেজ এবং ইন্টারমিডিয়েট কলেজের পড়ুয়ারা রয়েছেন। বিভিন্ন ঘাট ও নির্ধারিত স্থানের জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের আলাদা আলাদা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি দলকে নিজেদের নির্দিষ্ট এলাকায় প্রদীপ সাজানো এবং অনুষ্ঠানের দিন সেগুলি প্রজ্বলনের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘাটগুলিতে প্রস্তুতির কাজ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করা যায়।
রাম কি পৈড়ির ৫৬টি ঘাটের পাশাপাশি অযোধ্যার গুরুত্বপূর্ণ মন্দির, মঠ, কুণ্ড এবং জনসাধারণের স্থানগুলিকেও প্রদীপ দিয়ে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। শহরের বিভিন্ন ধর্মীয় ও পর্যটনস্থলে প্রায় তিন লক্ষ অতিরিক্ত প্রদীপ জ্বালানোর লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। সেই অনুযায়ী, গোটা রামনগরীকে প্রায় ৩৩ লক্ষ প্রদীপে আলোকিত করার প্রস্তুতি চলছে।
অযোধ্যার ২৪১টি মঠ-মন্দির এবং পাঁচকোশী পরিক্রমা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিতেও দীপোৎসব উপলক্ষে বিশেষ সাজসজ্জা করা হবে। এর ফলে মূল অনুষ্ঠানস্থলের পাশাপাশি শহরের অন্যান্য এলাকাতেও উৎসবের পরিবেশ তৈরি হবে।
এবারের দীপোৎসবে গুপ্তার ঘাটও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রথমবার প্রদীপ প্রজ্বলনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই কর্মসূচির চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণ এখনও বাকি।
এছাড়াও সূর্যকুণ্ড এবং দশরথ সমাধিস্থলকে প্রদীপ দিয়ে সাজানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। অযোধ্যার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলিকেও উৎসবের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। এর ফলে ভক্ত ও পর্যটকরা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে দীপোৎসবের আয়োজন উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।
দীপোৎসব উপলক্ষে অযোধ্যায় একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাসেরও প্রস্তুতি রয়েছে। প্রশাসনিক সূত্র অনুযায়ী, পর্যটন দফতরের পক্ষ থেকে মোট ২৮৪টি প্রকল্পের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পগুলির মোট ব্যয় প্রায় ৫৪৫২.৭৯ কোটি টাকা।
তালিকা অনুযায়ী, ১৫২টি প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ১৩২টি প্রকল্পের শিলান্যাস প্রস্তাবিত রয়েছে। এছাড়াও অযোধ্যায় সার্কিট হাউস এবং কচহরি চত্বরে বহুমুখী ভবন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলিও অনুষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে এই প্রকল্পগুলির উদ্বোধন ও শিলান্যাসের চূড়ান্ত কর্মসূচি পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হবে।
দীপোৎসবে প্রদীপের সাজসজ্জার পাশাপাশি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কর্মসূচিও থাকছে। সরযূ নদীর তীরে সমবেত আরতি, রামায়ণের বিভিন্ন প্রসঙ্গ অবলম্বনে পরিবেশনা এবং দেশের বিভিন্ন রাজ্যের লোকশিল্প প্রদর্শনের আয়োজন করা হবে। এই কর্মসূচির জন্য শিল্পী এবং আয়োজকদের প্রস্তুতি চলছে।
ঘাটগুলিতে প্রদীপের সারির পাশাপাশি আলোকসজ্জা ও অন্যান্য সাজসজ্জার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে, যাতে ভক্তরা অনুষ্ঠানের দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন
গত বছরও অযোধ্যার ৫৬টি ঘাটে লক্ষ লক্ষ প্রদীপ প্রজ্বলন করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেখানে ২৬ লক্ষেরও বেশি প্রদীপ জ্বালানো হয় এবং এই আয়োজনকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এবার ৩০ লক্ষ প্রদীপ জ্বালানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে আগের আয়োজনকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য প্রায় ৩৩ লক্ষ প্রদীপের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে পরিবহণ এবং সাজানোর সময় প্রদীপ ভেঙে গেলে তার ঘাটতি না হয়।
অযোধ্যার দীপোৎসব বর্তমানে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং পর্যটন কর্মকাণ্ডেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর এই অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক ভক্ত ও পর্যটকের সমাগম হয়। এবার উপরাষ্ট্রপতির উপস্থিতি এবং রাম মন্দিরে তাঁর হাতে প্রথম প্রদীপ প্রজ্বলনের পরিকল্পনা অনুষ্ঠানটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ৫৬টি ঘাটে ৩০ লক্ষ এবং শহরের অন্যান্য স্থানে অতিরিক্ত তিন লক্ষ প্রদীপ জ্বালানোর পরিকল্পনা নিয়ে গোটা রামনগরীকে প্রায় ৩৩ লক্ষ প্রদীপে আলোকিত করার প্রস্তুতি চলছে।










