ক্যালেন্ডারে ভাদ্রমাস শুরু হয়ে গেলেও আকাশে এখনও বর্ষার মেঘের দাপট। বর্ষার শেষ আর শরতের শুরুর এই সন্ধিক্ষণে আবহাওয়া দ্রুত বদলায়। কখনও বৃষ্টি, কখনও গরম ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ—ফলে শরীরের স্বাভাবিক হজমশক্তিতেও প্রভাব পড়তে পারে। আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়ে খাবারের দিকে একটু বেশি নজর দেওয়া জরুরি। কিছু খাবার পেটের অস্বস্তি ও অ্যাসিডিটি বাড়াতে পারে, আবার কিছু খাবার তুলনামূলকভাবে সহজপাচ্য।
![]()
ভাদ্রমাসে কেন খাবারের বিষয়ে সতর্কতা জরুরি?
আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী, ভাদ্রপদে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরে পিত্ত বা অম্লতার প্রবণতা বাড়তে পারে। তাই অ্যাসিডিটি বাড়ায় এমন খাবার কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞ পঙক্তি বৈদ্যর মতে, দই, ঘোল, টক খাবার এবং বিভিন্ন ফারমেন্টেড খাবার এই সময়ে এড়িয়ে চলা ভালো।এর পরিবর্তে দুধ, ক্ষীর কিংবা দুধ-চিঁড়ের মতো খাবার বেছে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দই-লস্যি নয়, দুধ ও ঘি হতে পারে বিকল্প
ভাদ্রমাসে দই এবং লস্যি খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আয়ুর্বেদীয় মত অনুযায়ী, দই শরীরে কফের প্রবণতা বাড়াতে পারে। ফলে সর্দি, কাশি বা সাইনাসের মতো ঋতুজনিত সমস্যার সঙ্গে অস্বস্তি বাড়তে পারে।অন্যদিকে, দুধ ও ঘি খাওয়া যেতে পারে বলে পরামর্শ রয়েছে। তবে ব্যক্তিভেদে খাবারের সহনশীলতা আলাদা হওয়ায় অতিরিক্ত কোনও খাবার গ্রহণ না করাই ভালো।
ঠান্ডা জল ও বরফ দেওয়া পানীয় থেকেও সাবধান
ভাদ্রপদে বর্ষার প্রভাব থাকায় শরীরের হজমক্ষমতা কিছুটা দুর্বল থাকতে পারে বলে আয়ুর্বেদে মনে করা হয়। তাই খুব ঠান্ডা জল বা বরফ দেওয়া পানীয় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।এ ধরনের পানীয় হজমের প্রক্রিয়ায় অস্বস্তি তৈরি করতে পারে বলে দাবি করা হয়। এর ফলে বদহজম, পেট ফাঁপা বা ভারী লাগার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ফ্রোজেন ডেজার্টেও লাগাম দিন
আইসক্রিম কিংবা অন্যান্য ফ্রোজেন ডেজার্টে সাধারণত চিনি ও দুগ্ধজাত উপাদান থাকে। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় এগুলি অতিরিক্ত খেলে কারও কারও ক্ষেত্রে হজমের সমস্যা বা পেট ফাঁপার মতো অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।তাই ভাদ্রমাসে ঠান্ডা মিষ্টি জাতীয় খাবার যতটা সম্ভব সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
![]()
কাঁচা সবজি ও স্যালাডে কেন সতর্কতা?
বর্ষাকালে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে জীবাণু, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবীর বিস্তার তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। ফলে কাঁচা শাকসবজি ঠিকমতো পরিষ্কার না করে খেলে পেটের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।স্যালাড বা স্মুদিতে কাঁচা সবজি খাওয়ার পরিবর্তে এই সময়ে সবজি ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া নিরাপদ বিকল্প হতে পারে। হালকা ভাপে সেদ্ধ, সেদ্ধ বা অল্প তেলে রান্না করা সবজি তুলনামূলকভাবে সহজপাচ্যও হতে পারে।
ভাদ্রমাসে কোন কোন সবজি এড়ানোর পরামর্শ?
প্রদত্ত আয়ুর্বেদীয় পরামর্শ অনুযায়ী, এই সময়ে সবুজ শাকসবজি, মূলা, বিট ও শসা এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। বেগুনের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, কারণ এতে পোকা থাকার আশঙ্কা থাকতে পারে এবং কারও ক্ষেত্রে গ্যাসের সমস্যা হতে পারে।তরমুজও বর্ষার এই সময়ে না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ডালের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ সতর্কতা
ভাদ্রমাসে মুসুর ডাল ও ছোলার ডাল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে অড়হর ডাল-সহ অন্যান্য ডাল খাওয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে।বর্ষাকালে হজমের সমস্যা এড়াতে খুব ভারী বা সহজে অস্বস্তি তৈরি করে এমন খাবার কম খাওয়াই এই পরামর্শের মূল লক্ষ্য।
মাংস, গুড়, তিল ও কিছু তেলও তালিকায় নেই
আয়ুর্বেদীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, ভাদ্রপদে মাংস, মধু, গুড়, তিল, তিলের তেল এবং নারকেল তেল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।এছাড়াও ঠান্ডা, বাসি কিংবা দীর্ঘদিন সংরক্ষিত খাবার না খাওয়াই ভালো। অতিরিক্ত ভাজাভুজি ও ফাস্ট ফুড থেকেও দূরে থাকার কথা বলা হয়েছে।
রাস্তার খাবার খাওয়ার আগে ভাবুন
বর্ষার সময়ে রাস্তার খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। খোলা জায়গায় খাবার তৈরি বা পরিবেশন করলে ধুলো, বৃষ্টির জল, মাছি কিংবা অন্যান্য দূষণের সংস্পর্শে আসতে পারে। আর্দ্র পরিবেশে খাবার দ্রুত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।তাই ভাদ্রমাসে বাইরে তৈরি অস্বাস্থ্যকর বা দীর্ঘক্ষণ খোলা অবস্থায় থাকা খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।
মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকুন
বর্ষার স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে মাছ ও শেলফিশ দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ভুলভাবে সংরক্ষণ করা বা বাসি মাছ খেলে খাদ্যবাহিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর ফলে বমি, ডায়রিয়া, পেটের সংক্রমণ কিংবা জলশূন্যতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।তাই মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে সতেজতা ও সঠিক সংরক্ষণের দিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে।
![]()
চা-কফিও অতিরিক্ত নয়
ভাদ্রমাসে চা ও কফির মতো ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় অতিরিক্ত খাওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ রয়েছে। বেশি ক্যাফেইন গ্রহণে অ্যাসিডিটি বা পেট ফাঁপার মতো সমস্যা কারও কারও ক্ষেত্রে বাড়তে পারে।তাই দিনের পর দিন অতিরিক্ত চা-কফির উপর নির্ভর না করে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের দিকে নজর দেওয়া ভালো।
ভাদ্রমাসে কী খাবেন, এক নজরে
আয়ুর্বেদীয় পরামর্শ অনুযায়ী, এই সময়ে খাবারের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সহজপাচ্য ও পরিষ্কার খাবার বেছে নেওয়া। যেমন—
দুধ
ক্ষীর
দুধ-চিঁড়ে
ঘি
ভালোভাবে রান্না করা সবজি
অড়হর ডাল-সহ অন্যান্য উপযোগী ডাল
অন্যদিকে দই, লস্যি, ঠান্ডা পানীয়, আইসক্রিম, বাসি খাবার, অতিরিক্ত ভাজা খাবার, ফাস্ট ফুড এবং মুসুর ও ছোলার ডাল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
![]()
ভাদ্রমাস মানেই বর্ষার শেষ পর্ব ও শরতের আগমনের সময়। একদিকে বাতাসে আর্দ্রতা, অন্যদিকে মাঝে মাঝেই গরম—এই পরিবর্তনশীল আবহাওয়ায় হজমের সমস্যা, অ্যাসিডিটি ও পেটের গোলমালের প্রবণতা বাড়তে পারে। আয়ুর্বেদে এই সময় খাবারের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। দই, লস্যি, কিছু ডাল, কাঁচা সবজি, বাসি খাবার ও অতিরিক্ত ভাজাভুজি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।








