বিহারে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ, বেগুসরাইয়ে পানি জমা রাস্তায় ফিতা কেটে ‘সুইমিং পুল’ ঘোষণা

বিহারে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় বেগুসরাইয়ে গ্রামবাসীদের প্রতিবাদ, রাস্তায় জমা পানির মধ্যে ফিতা ও কেক কেটে ‘সুইমিং পুল’ ঘোষণা। নালন্দার সরমেরায় ধানের ফসল জলমগ্ন হওয়ার খবর।
বিহারে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ, বেগুসরাইয়ে পানি জমা রাস্তায় ফিতা কেটে ‘সুইমিং পুল’ ঘোষণা
Photo Credit / Attribution: Google

বিহারে বন্যা ও জলাবদ্ধতার পরিস্থিতিতে মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। একাধিক এলাকায় বাড়ি, রাস্তা ও কৃষিজমিতে পানি পৌঁছে গেছে। বেগুসরাইয়ের ছৌড়াহী ব্লকের ঐজানি পঞ্চায়েতের রাজোপুর ওয়ার্ড নম্বর একে দীর্ঘদিনের জলনিকাশির সমস্যার প্রতিবাদে গ্রামবাসীরা রাস্তায় জমে থাকা পানির মধ্যে ফিতা কেটে এবং কেক কেটে প্রতীকীভাবে রাস্তাটিকে ‘সুইমিং পুল’ ঘোষণা করেছেন।

গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, এটি কোনো উৎসবের অনুষ্ঠান নয়। দীর্ঘদিন ধরে জলনিকাশির সমস্যা চলতে থাকায় প্রশাসন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত দফতরগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই এই প্রতীকী প্রতিবাদ করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তা থেকে পানি সরানো না হলে সেটিকে ‘সুইমিং পুল’ হিসেবেই ধরে নেওয়া ভালো।

স্থানীয় রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজোপুর ওয়ার্ড নম্বর একে বৃষ্টির পর পাকা রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী মোটরবাইকের সাইলেন্সার পর্যন্ত পানিতে ডুবে যাচ্ছে। শিশু, মহিলা, বয়স্ক এবং অন্যান্য পথচারীদের এই পানির মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।

গ্রামবাসীদের দাবি, প্রায় ৫০০ জন মানুষ জলাবদ্ধতায় প্রভাবিত এবং প্রায় ৫০টি বাড়িতে পানি ঢোকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার কারণে শুধু যাতায়াতের সমস্যা নয়, আশপাশে নোংরা ও মশার উপদ্রবও বাড়ছে। মশাবাহিত ও জলবাহিত রোগ নিয়েও গ্রামবাসীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পানির মধ্যে নিয়মিত চলাচল করতে হওয়ায় শিশু ও বয়স্কদের সমস্যাও বাড়ছে।

গ্রামবাসীদের বক্তব্য, স্থায়ী জলনিকাশির ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি হলেই রাস্তা ও আশপাশের এলাকায় পানি জমে যায়। তাঁদের অভিযোগ, এটি এক-দুদিনের জলাবদ্ধতার সমস্যা নয়; দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি চলছে।

এই বন্যাপীড়িত পরিস্থিতির মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অভিনেত্রী পাখি তাঁদের অবস্থা দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বন্যার পানিতে ঘেরা পরিবার, জলাবদ্ধতায় সমস্যায় থাকা গ্রামবাসী এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সংগ্রাম করা মানুষের পরিস্থিতি তাঁকে নাড়া দেয়।

বন্যার সময় সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়ে সেই পরিবারগুলো, যাদের বাড়ির চারপাশে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে এবং স্বাভাবিক যাতায়াতও কঠিন হয়ে পড়ে। ছোট শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ সদস্য থাকা পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে বাজার, হাসপাতাল, স্কুল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থানে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে যায়।

বিহারের বিভিন্ন জেলায় বন্যার প্রভাব বিভিন্নভাবে দেখা যাচ্ছে। কোথাও গঙ্গার পানি কৃষিজমিতে পৌঁছেছে, আবার কোথাও স্থানীয় নদী ও জলনিকাশি ব্যবস্থার কারণে গ্রাম ও রাস্তায় পানি জমেছে।

নালন্দার সরমেরা টাল এলাকাতেও গঙ্গার ব্যাকওয়াটারের প্রভাব কৃষকদের সমস্যায় ফেলেছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, পেঁদি ও পুরানি ইসুয়া গ্রামের এলাকায় প্রায় ২০০ বিঘা ধানের জমি পাঁচ ফুট পর্যন্ত পানিতে ডুবে গিয়েছিল।

এই পরিস্থিতি দেখায়, বন্যার প্রভাব শুধু নদীর তীরে থাকা গ্রামগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। গঙ্গার ব্যাকওয়াটার নিচু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। জেলার কয়েকটি স্থানীয় নদীর জলস্তর কমে এলেও সরমেরার টাল এলাকায় গঙ্গার ফিরে আসা পানির কারণে কৃষকদের সমস্যা বেড়েছে।

বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রভাব কৃষক এবং গ্রামীণ পরিবারগুলোর জীবিকার ওপরও পড়ে। জমিতে পানি ঢুকে পড়লে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। কৃষকরা বীজ, সার, শ্রম, চাষ এবং রোপণের জন্য আগেই অর্থ খরচ করে থাকেন। ফলে ফসল ডুবে যাওয়ার অর্থ শুধু শস্যের ক্ষতি নয়, কৃষিতে করা সম্পূর্ণ খরচ এবং ভবিষ্যতের আয়ের ওপরও প্রভাব পড়া।

নালন্দার সরমেরায় কৃষকরা ফসলের ক্ষয়ক্ষতির সমীক্ষা এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবিও তুলেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি মূল্যায়নের দাবি জানানো হয়েছে।

বেগুসরাইয়ে জলাবদ্ধতার আরেকটি দিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে মশার সংখ্যা বাড়তে পারে এবং নোংরা পরিবেশের কারণে সংক্রমণের আশঙ্কাও বাড়ে। গ্রামবাসীরা মশার উপদ্রবের পাশাপাশি সাপ-বিচ্ছুর মতো প্রাণীর ঝুঁকির কথাও জানিয়েছেন।

এ ধরনের এলাকায় জলনিকাশির পাশাপাশি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্য দফতরের নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।

গ্রামীণ এলাকায় বন্যার সময় সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো যাতায়াত। রাস্তা পানিতে ডুবে গেলে বাজার, হাসপাতাল, স্কুল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়। ছোট শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ সদস্য থাকা পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অনেক জায়গায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতেও মানুষকে পানির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

বেগুসরাইয়ের রাজোপুরে গ্রামবাসীদের প্রতিবাদ এই সমস্যাকেই সামনে এনেছে। সাধারণত মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য রাস্তা তৈরি করা হয়। কিন্তু সেই রাস্তা দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকলে তা ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতির প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে গ্রামবাসীরা ফিতা কেটে ‘সুইমিং পুল’ উদ্বোধন এবং কেক কেটে প্রতিবাদ জানান।

পরবর্তী রিপোর্টে নালন্দার সরমেরা এলাকার পরিস্থিতি আরও গুরুতর হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বরের রিপোর্ট অনুযায়ী, পেঁদি, সদহা এবং পুরানি ইসুয়ার খন্ধ এলাকায় পানির গভীরতা ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেখানে ৩৫০ বিঘার বেশি ধানের ফসল ডুবে যাওয়ার কথা সামনে এসেছে।

জমিদারি বাঁধগুলোর ওপর ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন সংবেদনশীল এলাকায় বালির বস্তা বসানো এবং ২৪ ঘণ্টা নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে।

বন্যার পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো এলাকায় একদিন পানি কমতে দেখা গেলেও অন্য এলাকায় ব্যাকওয়াটার বা বাঁধের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি এবং সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।

বেগুসরাইয়ের রাজোপুরের গ্রামবাসীদের কাছে এখন প্রধান দাবি হলো জলাবদ্ধতা থেকে দ্রুত মুক্তি এবং স্থায়ী জলনিকাশির ব্যবস্থা। তাঁদের বক্তব্য, প্রতি বর্ষায় রাস্তা পানিতে ডুবে গেলে শুধু অস্থায়ী ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতি এড়াতে নালা, কালভার্ট এবং জলনিকাশি ব্যবস্থা সুসংগঠিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বন্যাপীড়িতদের সঙ্গে দেখা করে পাখির আবেগপ্রবণ হওয়া এবং বেগুসরাইয়ের গ্রামবাসীদের প্রতীকী প্রতিবাদ—দুটি ঘটনাই বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তৈরি হওয়া সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাড়ি, স্বাস্থ্য, জীবিকা, কৃষি এবং দৈনন্দিন যাতায়াত প্রভাবিত হচ্ছে।

প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সামনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে পানি সরানো, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের ফসলের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেসব এলাকায় জলস্তর বাড়ছে, সেখানে নিয়মিত নজরদারি এবং দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ থাকা এলাকায় স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি উঠেছে। গ্রামবাসীদের দাবি, তাঁদের সমস্যাকে শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণের বিষয় হিসেবে না দেখে স্থায়ী জলনিকাশির সমাধানের সঙ্গে বিবেচনা করা হোক।

Leave a comment