বিকেলের চায়ের সঙ্গে গরমাগরম শিঙাড়া পেলে মন ভাল হতে বাধ্য। আর শীতের শুরুতে বাজারে ফুলকপি উঠলেই বাঙালির পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নেয় ফুলকপির শিঙাড়া। বাইরে মুচমুচে আবরণ আর ভিতরে মশলাদার আলু-ফুলকপির পুর—এক কামড়েই জমে যায় আড্ডা। ভাবছেন, বাড়িতে কীভাবে বানাবেন দোকানের মতো শিঙাড়া? ময়দার ময়ান থেকে শুরু করে পুরের সাত মশলা, সবকিছুর সঠিক মাপ ও পদ্ধতি জেনে নিন।
এক ডজন শিঙাড়া বানাতে কী কী উপকরণ লাগবে?
প্রায় ১২টি শিঙাড়া তৈরির জন্য প্রথমেই ময়দার খামির তৈরি করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন—
- ময়দা: ২৪০ গ্রাম
- নুন: ৫ গ্রাম
- চিনি: ১২ গ্রাম
- ঘি: ৩৫ গ্রাম
- প্রয়োজনমতো জল
পুর তৈরির জন্য লাগবে—
- আলু: প্রয়োজনমতো
- ফুলকপির ফুল: ১২৫ গ্রাম
- চিনাবাদাম: পরিমাণমতো
- কাঁচালঙ্কা ও আদা
- শুকনো লঙ্কা: ২টি
- পাঁচফোড়ন
- সরষের তেল: ২৫ গ্রাম
- চিনি ও নুন
- কসুরি মেথি
দোকানের মতো খোলস পেতে ময়ান দেওয়ার কৌশল
শিঙাড়ার আসল মজা তার মুচমুচে বাইরের আবরণে। তাই ময়দা মাখার সময় ময়ান দেওয়ার পদ্ধতিতে বিশেষ নজর দিতে হবে।প্রথমে একটি পাত্রে ২৪০ গ্রাম ময়দা নিন। তাতে নুন, চিনি ও ঘি মিশিয়ে হাত দিয়ে ভাল করে ঘষে নিন। এমনভাবে মাখুন, যাতে ময়দার দানা দেখতে অনেকটা ব্রেডক্রাম্বের মতো ঝুরঝুরে হয়। এই অবস্থাকেই সঠিক ময়ান বলা যায়।এরপর অল্প অল্প করে জল দিয়ে ময়দা মেখে নিন। খেয়াল রাখবেন, খামির যেন অতিরিক্ত নরম বা খুব শক্ত না হয়ে যায়। মাখা হয়ে গেলে ঢাকা দিয়ে প্রায় ৩০ মিনিট রেখে দিন।
সাত মশলার মিশ্রণেই আসবে আসল স্বাদ
ফুলকপির শিঙাড়ার পুর সুস্বাদু করতে সাত রকম মশলার একটি বিশেষ মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। এর জন্য লাগবে—
- জিরেগুঁড়ো: ৪ গ্রাম
- ধনেগুঁড়ো: ৫ গ্রাম
- হলুদগুঁড়ো: ৪ গ্রাম
- লঙ্কাগুঁড়ো: ৩ গ্রাম
- আমচুর: ২ গ্রাম
- গরমমশলা: ২ গ্রাম
- চাটমশলা: ৬ গ্রাম
সব মশলা একসঙ্গে নিয়ে ভালভাবে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণ শিঙাড়ার পুরে ব্যবহার করলে স্বাদে আসবে বিশেষ মাত্রা। চাইলে বাড়তি মশলা সংরক্ষণ করে আলুর তরকারির মতো অন্যান্য পদেও ব্যবহার করতে পারেন।
কীভাবে তৈরি করবেন ফুলকপি ও আলুর মশলাদার পুর?
প্রথমে আলু ভাল করে ধুয়ে খোসাসমেত প্রায় ১ সেন্টিমিটার মাপের ছোট ছোট টুকরো করে কাটুন। ১২৫ গ্রাম ফুলকপির ফুলও ছোট করে কেটে নিন। এরপর আদা ও কাঁচালঙ্কা নুন দিয়ে থেঁতো করে রাখুন।এবার কড়াইয়ে সরষের তেল গরম করে চিনাবাদাম সোনালি করে ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে ফুলকপির টুকরোগুলি প্রায় ৪ মিনিট ভেজে আলাদা করে সরিয়ে নিন।এরপর ওই তেলেই শুকনো লঙ্কা, পাঁচফোড়ন ও নুন দিন। সুগন্ধ বের হলে আলুর টুকরো দিয়ে মাঝারি আঁচে প্রায় ৪ মিনিট ভাজুন। তারপর আদা ও কাঁচালঙ্কার বাটা দিয়ে আরও ২ মিনিট কষিয়ে নিন।এবার তৈরি করে রাখা মশলার মিশ্রণ, গরমমশলা ও কসুরি মেথি দিয়ে ভালভাবে নাড়ুন। অল্প গরম জল দিয়ে প্রায় ৫ মিনিট রান্না করুন। কড়াইয়ে লেগে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে প্রয়োজনমতো আরও গরম জল দিতে পারেন।সবশেষে ভাজা ফুলকপি, চিনাবাদাম ও সামান্য চিনি দিয়ে নাড়তে থাকুন। আলু সিদ্ধ হয়ে গেলে এবং পুরের জল শুকিয়ে মিশ্রণটি ঝরঝরে হয়ে এলে গ্যাস বন্ধ করুন। শিঙাড়ায় ভরার আগে পুর সম্পূর্ণ ঠান্ডা করে নিতে হবে।
নিখুঁত ত্রিকোণ শিঙাড়া বানানোর সহজ পদ্ধতি
শিঙাড়ার স্বাদ যেমন জরুরি, তেমনই তার আকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে মাখা ময়দা থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে নিন। প্রতিটি লেচি একটু মোটা ও লম্বাটে করে বেলে মাঝখান থেকে দু’ভাগ করুন।এবার প্রতিটি অর্ধেক অংশের একটি দিক সামান্য জল দিয়ে ভিজিয়ে হাতের সাহায্যে মুড়ে শঙ্কু বা চোঙের মতো আকৃতি তৈরি করুন। খেয়াল রাখবেন, জোড়ের অংশ যেন ভালভাবে আটকে যায়।এরপর তৈরি করা শঙ্কুর ভিতরে ঠান্ডা পুর ভরুন। একেবারে মুখ পর্যন্ত পুর দেবেন না, সামান্য ফাঁকা জায়গা রাখুন। উপরের ধারায় জল লাগিয়ে দু’দিক চেপে বন্ধ করে দিন। এভাবেই তৈরি হয়ে যাবে সুন্দর ত্রিকোণ আকৃতির শিঙাড়া।
মুচমুচে করতে ভাজার সময় মানুন এই নিয়ম
শিঙাড়া ভাজার সময় তেলের তাপমাত্রা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তেল অতিরিক্ত গরম হলে বাইরে দ্রুত রং ধরে যাবে, কিন্তু ভিতরের ময়দা ঠিকমতো সেদ্ধ হবে না।তাই তেল মাঝারি বা সহনীয় গরম হলে শিঙাড়াগুলি কড়াইয়ে ছাড়ুন। মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে ভাজতে হবে, যাতে ভিতর পর্যন্ত সেদ্ধ হয় এবং বাইরের আবরণ সোনালি ও মুচমুচে হয়ে ওঠে। প্রায় ৩০ মিনিট ধরে ধীরে ভাজার কথা বলা হয়েছে। তৈরি হয়ে গেলে তেল ঝরিয়ে গরমাগরম পরিবেশন করুন।চায়ের কাপের সঙ্গে এই বাড়িতে তৈরি ফুলকপির শিঙাড়া পরিবেশন করলে বিকেলের আড্ডা হয়ে উঠবে আরও জমজমাট।
শীতের মরশুমে ফুলকপির শিঙাড়া মানেই বাঙালির বিকেলের আড্ডায় বাড়তি আনন্দ। বাইরে সোনালি মুচমুচে খোলস, ভিতরে আলু, ফুলকপি আর বাদামের মশলাদার পুর—এই স্বাদের জুড়ি মেলা ভার। তবে বাড়িতে শিঙাড়া বানাতে গিয়ে অনেক সময় দোকানের মতো স্বাদ ও মুচমুচে ভাব পাওয়া যায় না। সঠিক ময়ান, সাত রকম মশলার মিশ্রণ, পুর তৈরির কৌশল এবং নিখুঁত ভাঁজের কয়েকটি নিয়ম মেনে চললেই বাড়িতে তৈরি হবে দোকানের মতো ফুলকপির শিঙাড়া। রইল সহজ রেসিপি।













