মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে পরিচিত তিন নেতা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, মুম্বইয়ের একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে একই মঞ্চে উপস্থিত হলেন। অনুষ্ঠানে যোগ দেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ, শিবসেনা (ইউবিটি) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে এবং মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার (এমএনএস) সভাপতি রাজ ঠাকরে। তিন নেতাকে একসঙ্গে দেখে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হলেও ফড়নবিশ জানান, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দলের নেতাদের একসঙ্গে উপস্থিত হওয়া মহারাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরম্পরা।
মুম্বইয়ের দাদরের সাভারকর স্মারক সভাগৃহে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশকে হালকা মেজাজে দেখা যায়। তিন নেতার একই মঞ্চে উপস্থিতি নিয়ে মানুষের বিস্ময় প্রকাশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে এত অবাক হওয়ার কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না।
ফড়নবিশের বক্তব্য, মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভিন্ন মতাদর্শের নেতাদের একে অপরের সঙ্গে দেখা করা নতুন ঘটনা নয়। রাজনৈতিক বিরোধীরা কোনও অনুষ্ঠানে একসঙ্গে বসতে পারেন, হাসি-ঠাট্টা করতে পারেন, এমনকী চা-ও খেতে পারেন। তার জন্য তাঁদের রাজনৈতিক মতাদর্শ এক হওয়া প্রয়োজন নেই।
অনুষ্ঠানে উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গে তাঁর পুরনো সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন ফড়নবিশ। রসিকতার সুরে তিনি বলেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত উদ্ধব ঠাকরে যখনই তাঁকে ডাকতেন, তিনি সেখানে যেতেন। কিন্তু তার পর থেকে উদ্ধব আর তাঁকে ফোন করেননি। তিনি অবশ্য তাঁর আমন্ত্রণের অপেক্ষায় ছিলেন।
ফড়নবিশের এই মন্তব্যের পর দুই নেতার পুরনো রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়। ২০১৯ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের পর মুখ্যমন্ত্রীর পদ ভাগাভাগি নিয়ে বিজেপি এবং তৎকালীন অবিভক্ত শিবসেনার মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী দুই দলের মধ্যে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় জোট ভেঙে যায়। এরপর দুই দল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষে পরিণত হয়।
![]()
অনুষ্ঠানে তিন নেতার উপস্থিতি নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন এমএনএস প্রধান রাজ ঠাকরেও। তিনি বলেন, কিছু অনুষ্ঠান এমন হয়, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য সরিয়ে রেখে অংশগ্রহণ করা উচিত।
রাজ ঠাকরের মতে, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত অনুষ্ঠানের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। এ ধরনের আয়োজনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের একসঙ্গে উপস্থিত হওয়া মহারাষ্ট্রের পুরনো পরম্পরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রী আশিস শেলারও। তিনি অনুষ্ঠানে ফড়নবিশের উপস্থিতির প্রশংসা করেন। এর পর রাজ ঠাকরে রসিকতা করে বলেন, ফড়নবিশ যদি ২০২৯ সাল পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকেন, তাহলে ভবিষ্যতেও তাঁকে এ ধরনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়াও কার্টুন শিল্প নিয়ে কথাবার্তা হয়। একটি পুরনো ঘটনার কথা উল্লেখ করে ফড়নবিশ জানান, একবার তিনি রাজ ঠাকরেকে বলেছিলেন, তাঁর কার্টুন আঁকলে নাকটা যেন একটু বড় করে আঁকা হয়।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কার্টুন শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়। এর সাহায্যে সমাজ ও রাজনীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অল্প কথায় তুলে ধরা সম্ভব।
মারাঠি কার্টুনশিল্পীদের জন্য একটি পৃথক আর্ট গ্যালারি তৈরির আশ্বাসও দেন তিনি। এর মাধ্যমে তাঁদের সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সেই কাজগুলিকে পরিচিত করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান ফড়নবিশ।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে বলেন, একজন কার্টুনশিল্পীর কাছে তাঁর তুলি সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। একটি ভালো কার্টুনের মাধ্যমে বেশি শব্দ ব্যবহার না করেও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরা সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের কার্টুনশিল্পের কথাও স্মরণ করেন উদ্ধব। তিনি জানান, নির্মাণাধীন বাল ঠাকরে স্মারকে তাঁর আঁকা কার্টুনগুলি সংরক্ষণ করে রাখা হবে। এর ফলে আগামী প্রজন্ম তাঁর সৃজনশীল কাজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
অনুষ্ঠানে 'মহারাষ্ট্রাচ্যা হাস্যরেষা' বইটির প্রকাশ করা হয়। প্রবীণ কার্টুনশিল্পী প্রশান্ত কুলকর্ণী সম্পাদিত এবং গ্রন্থালি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত এই বইয়ে মারাঠি কার্টুন শিল্পের প্রায় ১০০ বছরের ইতিহাস সংকলিত হয়েছে।
বইটিতে ৭৫ জন কার্টুনশিল্পীর কাজ ও তাঁদের অবদান তুলে ধরা হয়েছে। বইটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত দলটির প্রশংসা করেন ফড়নবিশ। অন্যদিকে, উদ্ধব ঠাকরে বইটিকে একটি অমূল্য ঐতিহাসিক সংকলন বলে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানটি মূলত সাংস্কৃতিক আয়োজন হলেও তিন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একই মঞ্চে উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তবে এই সাক্ষাৎকে নতুন কোনও রাজনৈতিক জোট গঠনের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করার মতো কোনও নির্দিষ্ট ভিত্তি সামনে আসেনি।












