কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে উপকূলীয় কর্ণাটকে কংগ্রেসের অবস্থান শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছেন। ১৮ সেপ্টেম্বর ম্যাঙ্গালুরুতে প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভার বৈঠককে এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কর্ণাটকে ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি ধীরে ধীরে গতি পাচ্ছে। এরই মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার উপকূলীয় কর্ণাটকের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছেন। সরকারের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যে ১৮ সেপ্টেম্বর ম্যাঙ্গালুরুতে হতে চলা মন্ত্রিসভার বৈঠক রয়েছে। বৈঠকটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। দক্ষিণ কন্নড় ও উদুপি দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) শক্তিশালী নির্বাচনী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস সরকারের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাড়ানোকে ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ম্যাঙ্গালুরু দক্ষিণ কন্নড় জেলার সদর দফতর এবং উপকূলীয় কর্ণাটকের রাজনীতিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই অঞ্চলে BJP এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) দীর্ঘ সময় ধরে শক্তিশালী সাংগঠনিক ও আদর্শগত ভিত্তি তৈরি করেছে।
দক্ষিণ কন্নড় ও উদুপি মিলিয়ে মোট ১৩টি বিধানসভা আসন রয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ কন্নড়ে আটটি এবং উদুপিতে পাঁচটি আসন রয়েছে। ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে BJP এই ১৩টি আসনের মধ্যে ১১টিতে জয় পেয়েছিল। দলটি উদুপির পাঁচটি আসনই এবং দক্ষিণ কন্নড়ের ছয়টি আসন জিতেছিল। কংগ্রেস মাত্র দুটি আসনে সাফল্য পেয়েছিল।
তবে এই অঞ্চলের নির্বাচনী ইতিহাস পুরোপুরি একতরফা নয়। ২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস উপকূলীয় অঞ্চলের ১৩টি আসনের মধ্যে ১০টিতে জয় পেয়েছিল। এরপর BJP এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আবার শক্তিশালী করে। ফলে কংগ্রেসের কাছে ২০১৩ সালের ফলাফল একটি ইঙ্গিত যে উপকূলীয় কর্ণাটকে রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তিত হতে পারে।
২০২৩ সালে কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনে ১৩৫টি আসন নিয়ে কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরেছিল। দলের নির্বাচনী কৌশলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়ার সঙ্গে যুক্ত সামাজিক জোট এবং AHINDA রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। AHINDA-তে broadly সংখ্যালঘু, অনগ্রসর শ্রেণি এবং দলিত সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়।
এখন শিবকুমারের সামনে শুধু ২০২৩ সালের সাফল্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ নেই। ২০২৮ সালে বিধানসভায় নিজেদের আসনসংখ্যা বাড়াতে দলকে নতুন রাজনৈতিক এলাকায় নিজেদের পরিসর সম্প্রসারণ করতে হবে। উপকূলীয় কর্ণাটক সেই সম্ভাব্য সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হতে পারে।
বেঙ্গালুরুর রাজনৈতিক সাংবাদিক প্রশান্ত নাটুর মতে, দক্ষিণ কন্নড় ও উদুপিতে BJP প্রায় তিন দশক ধরে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাঁর মতে, ম্যাঙ্গালুরুতে মন্ত্রিসভার বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন ধরে BJP-কে সমর্থন করে আসা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
শিবকুমারের বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের কিছু অংশের কাছে পৌঁছানোর প্রচেষ্টাও রয়েছে। কর্ণাটকের রাজনীতিতে লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়কে ঐতিহ্যগতভাবে BJP-এর গুরুত্বপূর্ণ সমর্থনভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রশান্ত নাটুর মূল্যায়ন অনুযায়ী, কংগ্রেস দুটি পৃথক ক্ষেত্রে BJP-কে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করতে পারে। একদিকে মধ্য ও উত্তর কর্ণাটকে লিঙ্গায়েত সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা হতে পারে, অন্যদিকে উপকূলীয় কর্ণাটকে BJP-এর শক্তিশালী ভিত্তি দুর্বল করার চেষ্টা হতে পারে।
তবে উপকূলীয় অঞ্চলে কংগ্রেসের চ্যালেঞ্জ আলাদা। এখানে BJP-এর প্রভাব শুধু নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক, সামাজিক ও আদর্শগত নেটওয়ার্কের সঙ্গেও তা যুক্ত।
উপকূলীয় কর্ণাটকে কংগ্রেসের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল সম্ভবত BJP-এর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ভিত্তি একসঙ্গে বদলে দেওয়া নয়; বরং কয়েকটি শক্তিশালী আসনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলা।
কংগ্রেস যদি ঐতিহ্যগতভাবে BJP-এর নিরাপদ আসন হিসেবে বিবেচিত কয়েকটি কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন করে তুলতে পারে, তাহলে ২০২৮ সালের নির্বাচনে দলের মোট আসনসংখ্যার অবস্থার উন্নতি হতে পারে। এই কারণে দলের কাছে কয়েকটি আসনে জয় পাওয়ার আগে BJP-এর জয়ের ব্যবধান কমানোও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য হতে পারে।
শিবকুমারের উপকূলীয় কৌশল শুধু আদর্শগত বা রাজনৈতিক বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই। উন্নয়ন, পর্যটন, পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থানকে এই অঞ্চলে কংগ্রেস সরকারের পৌঁছনোর প্রধান ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা হতে পারে।
রাজ্য সরকার বিভিন্ন দফতরকে উপকূলীয় কর্ণাটক সম্পর্কিত প্রস্তাব চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছে। এই প্রস্তাবগুলি ম্যাঙ্গালুরুতে হতে চলা মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনার জন্য রাখা হতে পারে। এর ফলে বৈঠকের প্রশাসনিক এজেন্ডাও আঞ্চলিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
পর্যটনও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় শিবকুমার উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য পৃথক পর্যটন নীতি তৈরির পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন।
কর্ণাটক পর্যটন দফতরের ‘ব্র্যান্ড করাবলি’ পরিকল্পনা উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য একটি বিস্তৃত রোডম্যাপ হিসেবে সামনে এসেছে। এর আওতায় প্রায় ₹১,২৬০ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মসূচির উল্লেখ করা হয়েছে।
পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে কংগ্রেস উপকূলীয় কর্ণাটকের রাজনীতিতে একটি পৃথক রাজনৈতিক ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে পরিচয় ও মতাদর্শভিত্তিক রাজনীতির জন্য পরিচিত। এই পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, পর্যটন ও পরিকাঠামোর মতো বিষয় সামনে আনা কংগ্রেসের জন্য একটি বিকল্প রাজনৈতিক বার্তা তৈরির মাধ্যম হতে পারে।
শিবকুমারের কৌশল উপকূলীয় কর্ণাটকের রাজনৈতিক মানচিত্রে কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। দক্ষিণ কন্নড় ও উদুপিতে BJP-এর শক্তি কোনও একটি সরকার বা নির্বাচনী চক্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দলটি কয়েক দশকে শক্তিশালী সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও আদর্শগত ভিত্তি তৈরি করেছে।
তবে কংগ্রেসের জন্য ২০১৩ সালের ফলাফল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ওই নির্বাচনে দলটি অঞ্চলের ১৩টি আসনের মধ্যে ১০টিতে জয় পেয়ে দেখিয়েছিল যে উপকূলীয় কর্ণাটকের রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি স্থায়ী নয়।
এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য সম্ভবত গোটা অঞ্চলে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো নয়; বরং BJP-এর শক্তিশালী ঘাঁটিগুলিতে নির্বাচনী লড়াইকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলা। ১৮ সেপ্টেম্বরের ম্যাঙ্গালুরু মন্ত্রিসভার বৈঠক এই বৃহত্তর কৌশলের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত শিবকুমারকে ২০২৩ সালে কংগ্রেসের জয়ের পেছনে তৈরি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে গিয়ে নতুন জোট গড়ে তুলতে হবে। উপকূলীয় কর্ণাটকে সক্রিয়তা এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যেখানে কংগ্রেস BJP-এর দীর্ঘদিনের শক্তিশালী ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করছে।










