ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করে যুক্তরাষ্ট্রে তৃতীয় মেয়াদ নিয়ে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি আরও “৮ থেকে ৯ বছর” প্রেসিডেন্ট পদে থাকতে পারেন।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর অনুষ্ঠানে উপস্থিতদের মধ্যে হাসির প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে তিনি পরে বলেন, এটি কোনও রসিকতা নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে এখনও “অনেক কাজ বাকি” রয়েছে এবং তিনি সেই কাজ সম্পন্ন করতে চান।
এই মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা এবং সংবিধান সংশোধনের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা নতুন করে তীব্র হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু রাজনৈতিক মহলে এই নিয়ম পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বেড়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান অ্যান্ডি ওগলস প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ওই প্রস্তাবের লক্ষ্য ছিল সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ট্রাম্পকে তৃতীয়বার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, যদি কোনও ব্যক্তি টানা দুই মেয়াদ প্রেসিডেন্ট না থাকেন, তাহলে তিনি পুনরায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। তবে প্রস্তাবটি আর এগোয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন বলে বিবেচিত হয়। এ জন্য কংগ্রেসের উভয় কক্ষে, অর্থাৎ সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে, দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। পাশাপাশি ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে অন্তত ৩৮টির অনুমোদনও লাগবে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান পার্টির কাছে এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই এবং অঙ্গরাজ্য পর্যায়েও পর্যাপ্ত সমর্থন দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের পরিবর্তন বর্তমানে প্রায় অসম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট পদে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের সীমা ১৯৫১ সালে সংবিধানের ২২তম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এর আগে আনুষ্ঠানিক কোনও সীমা ছিল না। দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন স্বেচ্ছায় দুই মেয়াদের পর পদ ছেড়ে দিয়ে একটি রাজনৈতিক রীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
![]()
পরবর্তীতে ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে দুই মেয়াদের সীমা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়া আইনগত ও রাজনৈতিক—উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য কংগ্রেসে ৬৭ শতাংশ সমর্থন এবং ৩৮টি অঙ্গরাজ্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটিকে প্রায় অসম্ভব হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ বহু অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রভাব রয়েছে।
কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট পদে না ফিরলেও ট্রাম্প অন্য উপায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করতে পারেন। আলোচিত সম্ভাব্য কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২৮ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, কোনও ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন দিয়ে পর্দার আড়াল থেকে প্রভাব বজায় রাখা অথবা পরিবারের কোনও সদস্যকে রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে সামনে আনা। তবে এসব সম্ভাবনা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও জল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কিছু বিশেষজ্ঞ ট্রাম্পের সম্ভাব্য কৌশলের সঙ্গে রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার তুলনাও করছেন। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পরে সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী দিমিত্রি মেদভেদেভ প্রেসিডেন্ট হন এবং পুতিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি আবার প্রেসিডেন্ট পদে ফিরে আসেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো রাশিয়ার থেকে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পৃথকীকরণ স্পষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়েছে। তাঁর সমর্থকদের মতে, ট্রাম্পের নেতৃত্ব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, এই ধরনের মন্তব্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নির্ধারিত মেয়াদসীমা গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই নিয়ম পরিবর্তন কেবল আইনগত চ্যালেঞ্জই নয়, গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য কৌশলগত রাজনৈতিক বার্তাও হতে পারে। তাঁদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য তাঁর সমর্থকদের সক্রিয় রাখে এবং রাজনৈতিক আলোচনাকে তাঁর কেন্দ্র করে বজায় রাখতে সহায়তা করে।








