শরীরে মেদ বাড়লেই আমরা সাধারণত পেট, কোমর বা মুখের চর্বি নিয়ে চিন্তা করি। কিন্তু শরীরের ভিতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির চারপাশেও অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে। কিডনির আশপাশে এমন চর্বি জমাকে ঘিরেই সাম্প্রতিক গবেষণায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে স্থূলতার সঙ্গে বিপাকীয় সমস্যা যুক্ত হলে কিডনির উপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।
কী এই ‘Fatty Kidney’ বা কিডনির চারপাশে চর্বি?
কিডনির চারপাশে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাট বা চর্বি থাকতে পারে। এর মধ্যে renal sinus fat হল কিডনির অভ্যন্তরীণ অংশের কাছাকাছি থাকা চর্বি। অতিরিক্ত পরিমাণে এই ফ্যাট জমা হওয়া বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং কিডনির কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।এখানে ‘ফ্যাটি কিডনি’ বলতে সরাসরি কিডনির ভিতরে সাধারণ ফ্যাটি লিভারের মতো একই ধরনের রোগ বোঝানো হচ্ছে না। বরং কিডনির চারপাশে বা renal sinus অঞ্চলে অতিরিক্ত চর্বি জমার বিষয়টিই আলোচনায় রয়েছে।
AIIMS-এর গবেষণায় কী উঠে এসেছে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, AIIMS-এ ICMR-এর সহযোগিতায় করা একটি গবেষণায় চিকিৎসার জন্য আসা ৪৪ জন স্থূলকায় রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল স্থূলতা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে কিডনির চারপাশে চর্বি জমার সম্পর্ক বোঝা।গবেষণায় বিপাকীয়ভাবে অস্বাস্থ্যকর স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশের কিডনির চারপাশে অতিরিক্ত renal sinus fat পাওয়া যায়। বিপরীতে, বিপাকীয়ভাবে তুলনামূলক সুস্থ স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যে এই হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ।তবে গবেষণাটি ছোট পরিসরের হওয়ায় এই ফলাফলকে পুরো জনসংখ্যার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না। আরও বড় গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
শুধু BMI দেখলেই হবে না
গবেষণায় উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শরীরের ওজন বা BMI একাই পুরো ছবিটা প্রকাশ করে না। একই BMI থাকা দুজন মানুষের বিপাকীয় স্বাস্থ্য একেবারে আলাদা হতে পারে।কারও রক্তে শর্করা বা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে, শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার ধরন ও তার সম্ভাব্য প্রভাব অন্যরকম হতে পারে। তাই শুধু ওজন কমানো নয়, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও অন্যান্য বিপাকীয় সূচকও নজরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
স্থূলতার সঙ্গে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ যুক্ত হলে কিডনির উপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ ও রক্তে অতিরিক্ত শর্করা কিডনির রক্তনালি ও পরিস্রাবণ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।এই কারণেই কিডনি সুস্থ রাখতে শুধু ওজনের দিকে নজর দিলেই হবে না। নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রাও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
শুরুতে বোঝা কঠিন হতে পারে
কিডনির ক্ষতি সবসময় শুরুতেই স্পষ্ট উপসর্গ তৈরি করে না। সাধারণ কিডনি ফাংশন পরীক্ষাতেও প্রাথমিক পর্যায়ের সব ধরনের পরিবর্তন ধরা পড়বে—এমনটা নয়।এই কারণেই কিডনি নিয়ে ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা স্থূলতা থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
NGAL কী এবং কেন আলোচনায়?
গবেষণায় NGAL নামের একটি বায়োমার্কারের কথাও উঠে এসেছে। NGAL বা Neutrophil Gelatinase-Associated Lipocalin কিডনির ক্ষতি বা প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রোটিন।প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণায় কিডনির সম্ভাব্য ক্ষতির সঙ্গে NGAL-এর মাত্রার সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তবে NGAL-কে সাধারণ কিডনি পরীক্ষার নিয়মিত অংশ হিসেবে ব্যবহারের আগে আরও বড় পরিসরের গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।অর্থাৎ, বর্তমানে শুধুমাত্র NGAL-এর তথ্যের ভিত্তিতে নিজের কিডনির অবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
ডায়াবেটিস না থাকলেও কি ঝুঁকি থাকতে পারে?
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অন্য একটি AIIMS গবেষণাতেও ডায়াবেটিস না থাকা স্থূল প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে BMI এবং NGAL-এর মাত্রার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল।এর অর্থ এই নয় যে স্থূল প্রত্যেক ব্যক্তির কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বরং গবেষণাগুলি ইঙ্গিত করছে যে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ না থাকলেও অতিরিক্ত ওজন কিডনির উপর চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।তাই ওজন, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তার দিকে একসঙ্গে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কিডনি ভালো রাখতে কী করবেন?
কিডনি সুস্থ রাখতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যায়—
অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শে ধীরে ধীরে ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন।
নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন।
ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
অতিরিক্ত নুন ও অত্যধিক প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান।
নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন।
পর্যাপ্ত জল পান করুন, তবে কিডনি বা হৃদ্যন্ত্রের রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
প্রয়োজন ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করবেন না।
কিডনি সংক্রান্ত ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিডনি ফাংশন পরীক্ষা করান।
শরীরের অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে কিডনির চারপাশে চর্বি জমার সম্পর্ক রয়েছে। তবে শুধু BMI নয়, শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ। AIIMS ও ICMR-এর সহযোগিতায় করা একটি ছোট গবেষণায় স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যে কিডনির চারপাশে renal sinus fat জমার প্রবণতা দেখা হয়েছে। রক্তে শর্করা ও রক্তচাপের মতো বিপাকীয় সমস্যা থাকলে এই ধরনের চর্বি জমার সঙ্গে সম্পর্ক আরও বেশি দেখা গেছে।













