ঘাম-প্রস্রাব থেকে পচা মাছের মতো গন্ধ? বিরল ‘ফিশ ওডর সিনড্রোম’-এর কারণ জানলে চমকে যাবেন

ঘাম, প্রস্রাব, নিঃশ্বাস ও শরীরের নিঃসরণে পচা মাছের মতো গন্ধ কেন হয়? জানুন বিরল Fish Odour Syndrome বা Trimethylaminuria-এর কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণের উপায়।

মুখে দুর্গন্ধ হলে সাধারণত দাঁত, মাড়ি বা মুখের পরিচ্ছন্নতার দিকেই নজর যায়। কিন্তু যদি মুখের পাশাপাশি ঘাম, প্রস্রাব, নিঃশ্বাস এমনকী শরীরের বিভিন্ন নিঃসরণ থেকেও পচা মাছের মতো আঁশটে গন্ধ বের হতে থাকে, তাহলে বিষয়টি আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বিরল রোগ ট্রাইমিথাইলঅ্যামিনুরিয়া, যা ‘ফিশ ওডর সিনড্রোম’ নামেও পরিচিত, এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল শরীর থেকে এমন অস্বাভাবিক গন্ধ বের হওয়া।

কী এই ‘ফিশ ওডর সিনড্রোম’?

ট্রাইমিথাইলঅ্যামিনুরিয়া একটি বিরল বিপাকীয় সমস্যা। এই রোগে শরীর ট্রাইমিথাইলঅ্যামিন নামের একটি রাসায়নিককে স্বাভাবিকভাবে ভেঙে গন্ধহীন যৌগে পরিণত করতে পারে না। ফলে শরীরে ট্রাইমিথাইলঅ্যামিন জমতে থাকে এবং ঘাম, প্রস্রাব, নিঃশ্বাসসহ শরীরের বিভিন্ন নিঃসরণের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে।এই রাসায়নিকের নিজস্ব তীব্র আঁশটে গন্ধ রয়েছে। সেই কারণেই আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে অনেক সময় পচা মাছের মতো গন্ধ পাওয়া যায়।

কেন হয় এই বিরল রোগ?

এই রোগের অনেক ক্ষেত্রেই FMO3 জিনের জিনগত পরিবর্তন দায়ী। এই জিন থেকে তৈরি হওয়া এনজাইম শরীরে ট্রাইমিথাইলঅ্যামিনকে ভেঙে গন্ধহীন যৌগে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। কিন্তু জিনগত ত্রুটির কারণে এনজাইমটি ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরে ট্রাইমিথাইলঅ্যামিনের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।তবে সব ক্ষেত্রেই যে জিনগত কারণ থাকবে, তা নয়। নির্দিষ্ট কিছু খাবার অতিরিক্ত খাওয়া বা শরীরের অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যে পরিবর্তনের কারণেও সাময়িকভাবে এই ধরনের গন্ধ তৈরি হতে পারে।

কী কী লক্ষণ দেখা যায়?

এই রোগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হল শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে অস্বাভাবিক আঁশটে গন্ধ বের হওয়া। যেমন—

ঘাম থেকে পচা মাছের মতো গন্ধ

প্রস্রাবে তীব্র আঁশটে গন্ধ

নিঃশ্বাসে মাছের মতো দুর্গন্ধ

শরীরের বিভিন্ন নিঃসরণে একই ধরনের গন্ধ

কিছু ক্ষেত্রে প্রজনন অঙ্গের নিঃসরণ থেকেও গন্ধ পাওয়া যেতে পারে

এই গন্ধের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তি সামাজিক পরিস্থিতিতে অস্বস্তি, লজ্জা বা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতে পারেন। অনেক সময় সমস্যাটি শারীরিকের পাশাপাশি মানসিক চাপও তৈরি করে।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

শরীর থেকে অস্বাভাবিক গন্ধ বের হওয়ার আরও একাধিক কারণ থাকতে পারে। তাই প্রথমেই চিকিৎসককে অন্য সম্ভাব্য রোগ বা কারণগুলি বাদ দিতে হয়।ট্রাইমিথাইলঅ্যামিনুরিয়া শনাক্ত করতে সাধারণত প্রস্রাব পরীক্ষা করে ট্রাইমিথাইলঅ্যামিন এবং ট্রাইমিথাইলঅ্যামিন-এন-অক্সাইডের মাত্রার অনুপাত দেখা হতে পারে। প্রয়োজনে FMO3 জিনে জিনগত পরিবর্তন রয়েছে কি না, তা জানতেও জেনেটিক পরীক্ষা করা যেতে পারে।

চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের উপায় কী?

এই রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হল শরীরে ট্রাইমিথাইলঅ্যামিনের পরিমাণ কমানো এবং দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ করা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ট্রাইমিথাইলঅ্যামিন বা তার পূর্বসূরি সমৃদ্ধ নির্দিষ্ট খাবার কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।প্রয়োজনে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ট্রাইমিথাইলঅ্যামিন শোষণে সাহায্য করার জন্য অ্যাক্টিভেটেড চারকোল ব্যবহারের কথাও বিবেচনা করা হয়।তবে নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যাক্টিভেটেড চারকোল বা কোনও ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। রোগের কারণ নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মুখের দুর্গন্ধ হলেই কি এই রোগ?

একেবারেই নয়। মুখের দুর্গন্ধের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল দাঁত ও মাড়ির সমস্যা, মুখের পরিচ্ছন্নতার অভাব বা জিহ্বায় ব্যাকটেরিয়া জমা হওয়া। তাই শুধু মুখে দুর্গন্ধ হলেই ট্রাইমিথাইলঅ্যামিনুরিয়া হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।তবে যদি মুখের পাশাপাশি ঘাম, প্রস্রাব বা শরীরের অন্যান্য নিঃসরণ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে পচা মাছের মতো অস্বাভাবিক গন্ধ আসে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শরীর, নিঃশ্বাস, ঘাম বা প্রস্রাব থেকে যদি বারবার পচা মাছের মতো তীব্র গন্ধ বের হয়, তাহলে বিষয়টি শুধুই পরিচ্ছন্নতার অভাব নাও হতে পারে। বিরল বিপাকীয় রোগ ট্রাইমিথাইলঅ্যামিনুরিয়া বা ‘ফিশ ওডর সিনড্রোম’-এর কারণে এমনটা হতে পারে। কেন হয় এই সমস্যা, কী কী লক্ষণ দেখা যায় এবং কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, জেনে নিন।

Leave a comment