ধর্মে ভিন্ন, শিকড়ে এক! ভারত-ইরানের প্রাচীন যোগে লুকিয়ে হিন্দু দেবতার ছাপ

ভারত ও ইরানের ধর্মীয় ইতিহাসে রয়েছে চমকপ্রদ মিল। আর্য সংস্কৃতি, অগ্নি উপাসনা ও জরথ্রুষ্ট ধর্মে লুকিয়ে হিন্দু দেবতার ছাপ—জানুন বিস্তারিত।

ভারত মানেই হিন্দু ধর্মের আধার, আর ইরান একটি ইসলামিক রাষ্ট্র—এটাই বর্তমান বাস্তবতা। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, একসময় এই দুই দেশের ধর্মীয় বিশ্বাসে ছিল চমকপ্রদ মিল। সেই প্রাচীন যোগসূত্র আজও বিস্মিত করে গবেষকদের।

আর্যদের পথ ধরে একসূত্রে দুই দেশ

ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ৪ হাজার বছর আগে রুশ অঞ্চলের দিক থেকে আর্যদের আগমন ঘটে। এই আর্যরাই একদিকে ভারতে, অন্যদিকে প্রাচীন পারস্যে বসতি স্থাপন করেন। ফলে ভাষা, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস—সব ক্ষেত্রেই তৈরি হয় মিল।

অগ্নি উপাসনায় অভিন্নতা

ভারতের মতোই প্রাচীন পারস্যেও অগ্নির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। হিন্দু ধর্মে যজ্ঞ বা অগ্নিপূজা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই জরথ্রুষ্টীয় ধর্মেও আগুনকে জ্ঞান ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে মানা হয়। আজও সেই ঐতিহ্য বজায় রয়েছে ‘ফায়ার টেম্পল’-এ।

দেবতাদের মিল—ইন্দ্র, বরুণ থেকে ‘আহুর মাজদা’

প্রাচীন পারস্যে জরথ্রুষ্ট ধর্ম প্রচলিত ছিল, যার প্রবর্তক জরথ্রুষ্ট। এই ধর্মে ‘আহুর মাজদা’ প্রধান দেবতা। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, ‘আহুর’ শব্দটির সঙ্গে বেদের ‘অসুর’-এর মিল রয়েছে। একসময় ইন্দ্র, বরুণের মতো দেবতাদেরও পারস্যে মান্য করা হত।

ভাষা ও ধর্মগ্রন্থেও মিল

সংস্কৃত ও প্রাচীন পার্সিয়ান ভাষার মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর সাদৃশ্য। ঋগ্বেদ এবং জরথ্রুষ্টীয় গাথার ছন্দেও মিল পাওয়া যায়। এমনকি ‘হপ্ত হেন্দু’ শব্দটি ‘সপ্তসিন্ধু’ অঞ্চলেরই ইঙ্গিত বলে মনে করেন গবেষকরা।

ইসলামের আগমন ও পরিবর্তন

৬৫১ খ্রিস্টাব্দে পারস্যে ইসলামের আগমন ঘটে এবং ধীরে ধীরে জরথ্রুষ্টীয় ধর্মের প্রভাব কমে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তবে প্রাচীন সংস্কৃতির চিহ্ন এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।

পারসি সম্প্রদায়—ভারতের সঙ্গে সেতুবন্ধন

ইসলামিক শাসনের সময় বহু পারসি ভারতে আশ্রয় নেন। তাঁদের মাধ্যমেই দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে প্রতিরক্ষা—সব ক্ষেত্রেই পারসি সম্প্রদায়ের অবদান অনস্বীকার্য।

আজও অটুট কূটনৈতিক সম্পর্ক

বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত ও ইরানের সম্পর্ক যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক যোগসূত্র আজও দুই দেশের বন্ধুত্বকে দৃঢ় করে রেখেছে।

আজকের দিনে ভারত ও ইরান ধর্মীয়ভাবে আলাদা হলেও ইতিহাস বলছে অন্য কথা। প্রাচীন পারস্যে হিন্দু দেবতা, অগ্নি উপাসনা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর মিল ছিল। আর্যদের অভিন্ন উৎস থেকেই তৈরি হয়েছিল এই সাযুজ্য।

Leave a comment