সারাক্ষণ ত্বকে চুলকানি? অবহেলা নয়, নীরবে লিভার নষ্ট করছে হেপাটাইটিস! জেনে নিন অচেনা লক্ষণ ও কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে

হেপাটাইটিসের অচেনা লক্ষণ কী? ত্বকে চুলকানি, জন্ডিস, গাঢ় প্রস্রাব, ক্লান্তি-সহ লিভারের ক্ষতির সতর্কবার্তা, কারা বেশি ঝুঁকিতে এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন—জানুন বিস্তারিত।

হেপাটাইটিসকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই রোগটি দীর্ঘদিন কোনও স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই লিভারের ক্ষতি করে চলে। কিন্তু কিছু সূক্ষ্ম উপসর্গ রয়েছে, যেগুলি অবহেলা করলে বিপদ বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের কিছু পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিলে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।

হেপাটাইটিস কী? কেন হয় এই রোগ?

হেপাটাইটিস হল যকৃত বা লিভারের প্রদাহ। এটি ভাইরাস সংক্রমণ, অতিরিক্ত মদ্যপান, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অটোইমিউন রোগ বা বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে হতে পারে।

সবচেয়ে পরিচিত ভাইরাল ধরনগুলি হল—

হেপাটাইটিস A

হেপাটাইটিস B

হেপাটাইটিস C

হেপাটাইটিস D

হেপাটাইটিস E

হেপাটাইটিস A ও E সাধারণত দূষিত খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে ছড়ায়। অন্যদিকে B, C ও D সংক্রমিত রক্ত, শরীরের তরল বা অনিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

এই লক্ষণগুলি দেখলে সতর্ক হন

বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিসের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ অসুস্থতার মতো মনে হলেও এগুলি অবহেলা করা উচিত নয়।

দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক ক্লান্তি

বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি ক্লান্তি না কমে, তবে তা লিভারের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।

ক্ষুধামন্দা ও বমিভাব

হঠাৎ খাবারের প্রতি অনীহা, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া প্রাথমিক লক্ষণের মধ্যে পড়ে।

হালকা জ্বর

তীব্র ভাইরাল হেপাটাইটিসে শুরুতেই হালকা জ্বর দেখা দিতে পারে।

পেটের ডান দিকে ব্যথা

লিভার যেখানে থাকে, সেই অংশে চাপ লাগা, অস্বস্তি বা ভোঁতা ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

গাঢ় প্রস্রাব ও ফ্যাকাশে মল

বিলিরুবিন বেড়ে গেলে প্রস্রাব গাঢ় হলুদ বা বাদামি হতে পারে। একই সঙ্গে মলের রং অস্বাভাবিকভাবে ফ্যাকাশে বা ধূসর হয়ে যেতে পারে।

ত্বকে এই পরিবর্তন হলে অবহেলা করবেন না

হেপাটাইটিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হল জন্ডিস, অর্থাৎ ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া।

এছাড়াও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—

দীর্ঘদিন ধরে ত্বকে চুলকানি

অস্থিসন্ধি ও পেশীতে ব্যথা

ঘুমের সমস্যা

মনোযোগ কমে যাওয়া

সারাক্ষণ দুর্বল লাগা

এসব উপসর্গও দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি-র ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি—

স্বাস্থ্যকর্মী

ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি

একাধিক যৌনসঙ্গী বা অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক রয়েছে যাঁদের

হেপাটাইটিস বি-আক্রান্ত মায়ের নবজাতক

অপরীক্ষিত রক্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি

অনিরাপদ চিকিৎসা বা সূঁচ ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে যাঁদের

হেপাটাইটিস A বা E বেশি হয় এমন এলাকায় ভ্রমণকারী

দীর্ঘদিনের লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি

সময়ে চিকিৎসাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

হেপাটাইটিস দ্রুত ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই জটিলতা এড়ানো যায়। দীর্ঘদিন ক্লান্তি, জন্ডিস, ত্বকে চুলকানি, গাঢ় প্রস্রাব বা অন্য কোনও সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা ও লিভার ফাংশন টেস্টের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়।

হেপাটাইটিস অনেক সময় কোনও স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে। তবে ত্বকে দীর্ঘদিনের চুলকানি, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, গাঢ় প্রস্রাব বা ফ্যাকাশে মলের মতো লক্ষণ লিভারের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা শুরু করলে সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর এবং লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

Leave a comment