সাদা–হলুদ থেকে গোলাপি: কীভাবে বদলে গেল জয়পুরের রূপ? ৩০০ বছরের শহরের অজানা ইতিহাস প্রকাশ্যে

সাদা–হলুদ থেকে গোলাপি: কীভাবে বদলে গেল জয়পুরের রূপ? ৩০০ বছরের শহরের অজানা ইতিহাস প্রকাশ্যে

জয়পুর আজ বিশ্বখ্যাত ‘পিঙ্ক সিটি’। কিন্তু রাজস্থানের এই শহর জন্ম মুহূর্ত থেকে গোলাপি ছিল এমনটি নয়। মহারাজা সওয়াই জয় সিং দ্বিতীয়ের স্বপ্নে তৈরি এই পরিকল্পিত শহর সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে রূপে–রঙে। কখনও সাদা, কখনও হলুদ—শেষ পর্যন্ত অপারেশন পিঙ্কের হাত ধরে আজকের বিশ্বঐতিহ্য গোলাপি শহর। কেন, কীভাবে এই রূপান্তর—সেই গল্প একাধিক স্তরে লুকিয়ে ভবনের গায়ে গায়ে।

১৭২৭ সালে জন্ম জয়পুর: পরিকল্পিত নগরীর ভিত্তি

১৭২৭ সালের ১৮ নভেম্বর মহারাজা সওয়াই জয় সিং দ্বিতীয় ভিত্তি রাখেন জয়পুর শহরের। আরাবল্লির পাদদেশে, ছয়টি পুরোনো গ্রাম জুড়ে শুরু হয় নতুন শহর নির্মাণ। রাস্তার দৈর্ঘ্য–প্রস্থ, বাজারের নকশা, মন্দির–স্কুলের অবস্থান—সব কিছুই স্থপতিরা সতর্কভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন। তাই জয়পুর প্রথম থেকেই দেশের সবচেয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে তৈরি শহরদের তালিকায় উঠে আসে।

সাদা–হলুদ জয়পুর: গোলাপি হওয়ার আগের আসল রূপ

অধিকাংশ মানুষই জানেন না—জয়পুরের আসল রঙ ছিল সাদা ও হলুদ। রাজপরিবারের নির্দেশে এই রঙেই সাজানো হতো বাড়িঘর। ১৮শ শতকের হাওয়া মহল, নাহারগড় দুর্গ, যন্তর মন্তর বা রামবাগ—সব স্থাপত্যই তখন দেখত অন্যরকম।

রাম সিং-এর যুগে রঙ বদলের সূচনা

মহারাজা রাম সিং শহরের রঙ পাল্টে দেন প্রথমবার। অতিথিদের স্বাগত জানাতে তিনি শহরকে গোলাপি রঙে সাজান—আর সেখান থেকেই জন্ম ‘পিঙ্ক সিটি’ ধারণার। পরে মাধো সিং ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করেন, ইংল্যান্ড সফরের পর আধুনিকীকরণে জোর দেন।

১৯৭০–৯০ দশক: উন্নয়নের চাকা নতুনভাবে ঘোরে

এই সময়ে জনসংখ্যা বাড়ে, নগরও বদলে যায়। পুরোনো মহল্লা রক্ষা করে নতুন রাস্তা, নতুন বাজার, নতুন কলোনি তৈরির কাজ শুরু হয়। ২০২০ সালে অপারেশন পিঙ্ক-এর মাধ্যমে আবার শহরের গোলাপি পরিচয়কে পুনরুদ্ধার করা হয়—আর বিশ্বব্যাপী জয়পুরের ‘পিঙ্ক সিটি’ পরিচয় অফিসিয়ালি স্বীকৃতি পায়।

মন্দিরনগরী জয়পুর: কেন ‘ছোটি কাশী’?

শত শত প্রাচীন মন্দির জয়পুরকে ভারতের অন্যতম ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী শহর বানিয়েছে। পাহাড়চূড়ার দুর্গ, নয়টি দরজা, বাজারের অনন্য নকশা—সব মিলিয়ে জয়পুর আজ ভারতের সর্বাধিক ভ্রমণকরা শহরগুলির একটি।

মির্জা ইসমাইল: আধুনিক জয়পুরের স্থপতি

মহারাজা মান সিং-এর আমলে দেওয়ান স্যার মির্জা ইসমাইল জমি উন্নয়নের জন্য A, B, C, D ও E প্রকল্প শুরু করেন।আজমেরি গেট থেকে রেলস্টেশন পর্যন্ত তৈরি হয় নতুন রাস্তা, যার দু’পাশে গড়ে ওঠে বাজার।পঞ্চবাত্তি চত্বর, MI রোড—সবই তাঁর তত্ত্বাবধানে তৈরি।

৩০০ বছরের বিবর্তন: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

শিল্প, বিজ্ঞান, রাজনীতি, শিক্ষা, বাণিজ্য, পর্যটন—সব ক্ষেত্রেই জয়পুরের উন্নয়ন বহুস্তরীয়। পুরোনো স্থাপত্যের গায়ে আজও লেগে আছে ইতিহাসের ছাপ, আবার নতুন জয়পুর ভবিষ্যতের শহর হওয়ার পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে।

২৯৮তম প্রতিষ্ঠা দিবসের আবহে আবার উঠে এসেছে জয়পুরের পুরনো রঙ বদলের গল্প। একসময় সাদা-হলুদে সাজানো শহরটি কীভাবে রাম সিং, মাধো সিং ও মির্জা ইসমাইলের হাত ধরে গোলাপি রঙে পরিচিতি পেল, কীভাবে তৈরি হল বাজার, রাস্তা, প্রাসাদ—সেই ইতিহাস আজও শহরের প্রতিটি স্থাপত্যে ছাপ রেখে গেছে।

Leave a comment