১৮ বছর পর ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

১৮ বছর পর ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় ১৮ বছর পর ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যে চাপের মধ্যে উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক নির্ভরতা আরও বাড়বে।

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারত–ইইউ শীর্ষ সম্মেলনের সময় এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হচ্ছে। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কোস্তার সঙ্গে বৈঠক করছেন।

এই চুক্তি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন মার্কিন ট্যারিফ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য চাপের মধ্যে রয়েছে। ভারত ও ইইউ উভয়ের কাছেই এই সমঝোতাকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এর মাধ্যমে শুধু বাণিজ্য বৃদ্ধিই নয়, পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতাও শক্তিশালী হবে।

নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে আয়োজিত ভারত–ইইউ শীর্ষ সম্মেলন সকাল সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হয়। সম্মেলনে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সাপ্লাই চেন, প্রযুক্তি ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে ফ্রি ট্রেড চুক্তি সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রেস স্টেটমেন্ট জারি করা হবে।

২০০৭ সালে শুরু হওয়া ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষ চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা এই চুক্তির সমাপ্তির ঘোষণা শীর্ষ সম্মেলনের অংশ হিসেবে করা হচ্ছে।

ভারত ও ইইউর মধ্যে এই বৃহৎ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে মার্কিন ট্রেজারি মন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক সাক্ষাৎকারে ইউরোপের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেছে, অথচ ইউরোপ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তাঁর অভিযোগ, ইউরোপ নিজের স্বার্থে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে।

ভারত–ইইউ ফ্রি ট্রেড চুক্তির মূল লক্ষ্য উভয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়া। মার্কিন শুল্ক এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেনে বিঘ্নের প্রেক্ষাপটে এই সমঝোতা বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা আনবে।

চুক্তির আওতায় ট্যারিফ হ্রাসের ফলে ইউরোপীয় বাজারে ভারতীয় পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে প্রবেশ করবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় সংস্থাগুলি ভারতের বৃহৎ বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার পাবে। এই দীর্ঘদিনের অপেক্ষমান চুক্তির ফলে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।

বর্তমানে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ভারত ইইউর ২৭টি দেশে প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, আর ইউরোপ থেকে প্রায় ৬১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশই ইইউতে যায়। নতুন ফ্রি ট্রেড চুক্তির ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের ফলে টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, স্টিল, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং মেশিনারি খাতের ভারতীয় শিল্প ইউরোপীয় বাজারে বাড়তি সুযোগ পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফের কারণে যে খাতগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এই চুক্তির মাধ্যমে সেই প্রভাব আংশিকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

চুক্তির সুবিধা ইউরোপীয় দেশগুলির জন্যও প্রযোজ্য। এর ফলে ইউরোপ থেকে ভারতে গাড়ি, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, উন্নত মেশিনারি, ওয়াইন ও স্পিরিটের রপ্তানি বাড়বে। পাশাপাশি ভারতের উৎপাদন এবং গ্রিন টেকনোলজি খাতে ইউরোপীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

ভারত–ইইউ ফ্রি ট্রেড চুক্তি কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এই সমঝোতার মাধ্যমে উভয় পক্ষের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভারত ও ইউরোপ একে অপরের জন্য নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে অবস্থান শক্তিশালী করছে।

 

Leave a comment