ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখে না এবং যেকোনো নতুন সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বক্তব্যও তীব্র হয়েছে, যেটিকে ইরান তাদের “সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্র” হিসেবে বিবেচনা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু পশ্চিম এশিয়া নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান দীর্ঘদিন ধরে এটিকে নিজেদের কৌশলগত শক্তি হিসেবে দেখে আসছে। তেহরানের ধারণা, সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলে এই পথ নিয়ন্ত্রণ বা বাধাগ্রস্ত করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রণালীতে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন আন্তর্জাতিক তেলের দাম, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে কৌশলগত প্রস্তুতি জোরদার করেছে। সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইরানের সেনাবাহিনী এবং রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (IRGC) উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, ড্রোন ইউনিট এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার জনসমর্থন বজায় রাখা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধে প্রচারণা চালাচ্ছে। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও ইরান আলোচনার পথ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টায় উত্তেজনা বৃদ্ধির বিভিন্ন ইঙ্গিত সামনে এসেছে। ইরান দাবি করেছে, তারা মার্কিন MQ-9B এবং RQ-4 ড্রোনকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এছাড়া ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা F-35 যুদ্ধবিমানের ওপরও গুলি চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালীর কাছে মাইন পেতে দেওয়ার চেষ্টা করা নৌযান এবং ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ওপর হামলা চালানোর কথা যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ পদক্ষেপকে “আত্মরক্ষামূলক” ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
নেটব্লক্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে প্রায় ৮৮ দিন ধরে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ ছিল, যা আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘতম ইন্টারনেট শাটডাউন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকিং, ব্যবসা এবং সাধারণ জনজীবনে প্রভাব পড়েছে।
![]()
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েল ও লেবানন সীমান্তেও পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ বলে জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রায় ৫০টি শহর ও গ্রাম খালি করার সতর্কতা দিয়েছে এবং জানিয়েছে, এসব এলাকায় শিগগিরই বিমান হামলা হতে পারে। দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরের দিকে সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে মার্কিন সামরিক বিমানের উপস্থিতি দেখা গেছে। বেন গুরিয়ন এবং রেমন বিমানবন্দরে যুদ্ধবিমান ও জ্বালানি বহনকারী বিমান মোতায়েন রয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও এসব বিমান এখনও অবস্থান করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গাজা উপত্যকায়ও হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে হামাসের সামরিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক হামলায় হামাসের নতুন সামরিক প্রধানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে, যেখানে কয়েকজন নিহত ও আহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এখনও পাওয়া যায়নি।
গাজা সিটি, খান ইউনিসসহ অন্যান্য এলাকায় গোলাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতির খবর এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইরান নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতা সরকারের ইরান নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বলেছেন, বর্তমান কৌশলের কারণে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে।
একই সময়ে নিউইয়র্কে এক রাজনৈতিক নেতার বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভ হয়েছে, যেখানে বহু মানুষ আন্তর্জাতিক নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে।
সংযুক্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। যদিও কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি, ঘটনাটি পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তেলের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কার মধ্যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর কাছে নতুন আর্থিক সহায়তা চেয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুসলিম দেশগুলোর প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মুসলিম বিশ্বকে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।









