বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ছে কৃষি নির্ভর সমাজে। ভারতের মতো কৃষি প্রধান দেশে কৃষকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে কীভাবে খাদ্য, পুষ্টি ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ঝাড়গ্রামে অনুষ্ঠিত হল বিশেষ কৃষক মেলা।
কৃষি নির্ভর ভারতের সামনে জলবায়ু চ্যালেঞ্জ
আমাদের দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে কৃষি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় কৃষকদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে প্রান্তিক, অতি দরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবারগুলিকে কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাব মোকাবিলা করে টিকে থাকার পথ দেখানো যায়—তা নিয়েই এই কৃষক মেলার মূল ভাবনা।
কেন্দডাংড়িতে বিশেষ কৃষক মেলা
শুক্রবার ঝাড়গ্রামের জামবুনি ব্লকের কেন্দডাংড়ি দুর্গা মন্দির সংলগ্ন খেলার মাঠে এই কৃষক মেলার আয়োজন করা হয়। উদ্যোগী সংস্থা ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস সেন্টার (DRCSC)। চিচিড়া ও কেন্দডাংড়ি পঞ্চায়েত এলাকার প্রায় ৫৩০ জন তপশিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মানুষদের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে এই মেলার মাধ্যমে নানা কৌশল তুলে ধরা হয়।
জলবায়ু সহনশীল কৃষির উপর জোর
মেলায় প্রাকৃতিক সম্পদের সুস্থায়ী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্য, পুষ্টি ও জীবিকা নিরাপত্তা অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। কৃষকদের মধ্যে জলবায়ু সহনশীল চাষব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব কৃষি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোই ছিল ডিআরসিএসসির মূল লক্ষ্য।
২০টি স্টলে গ্রামবাংলার জীব বৈচিত্র্যের প্রদর্শনী
এই কৃষক মেলায় ছিল ২০টি স্টল। সেখানে তুলে ধরা হয়—
দেশীয় ও হারিয়ে যাওয়া কৃষিজ প্রজাতি
বনজ ও অবহেলিত শাকসবজি
স্থানীয় বীজ ও কৃষি প্রযুক্তি
পশু-পাখি, মাছ ও গাছপালা
বিকল্প শক্তির ব্যবহার
লোকায়ত জ্ঞান ও ঐতিহ্যবাহী চাষ পদ্ধতি
এর পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের পরিবেশবান্ধব জীবিকা গড়ে তোলার বার্তাও দেওয়া হয়।
প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ—ব্যাপক অংশগ্রহণ
মেলায় উপস্থিত ছিলেন ঝাড়গ্রাম জেলা ও জামবুনি ব্লকের বিভিন্ন সরকারি আধিকারিক, CSR প্রতিনিধি, কলেজ ও বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। পাশাপাশি জামবুনি ব্লকের চিচিড়া ও কেন্দডাংড়ি পঞ্চায়েত এলাকার ৩৫০ জনের বেশি মহিলা, চাষি, সমাজকর্মী, কিশোর-কিশোরী ও ছাত্রছাত্রী এই মেলায় অংশ নেন।
সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতায় মেলায় বাড়তি আকর্ষণ
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার পাশাপাশি মেলায় ছিল স্থানীয় শিল্পীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ছবি আঁকা, নাটক ও মুখাভিনয়। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশনা যেমন মেলায় প্রাণ ফেরায়, তেমনই অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের উদ্যোগ ও ভাবনা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যখন সরাসরি কৃষির উপর পড়ছে, তখন সেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই টেকসই কৃষি ও জীবিকা গড়ে তোলার বার্তা উঠে এল ঝাড়গ্রামের কৃষক মেলায়। ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস সেন্টারের (DRCSC) উদ্যোগে আয়োজিত এই মেলায় জলবায়ু সহনশীল চাষব্যবস্থা ও সামাজিক-আর্থিক উন্নয়নের পথ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।













