ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে ‘কম অক্সিজেন’ তত্ত্ব। ভারতীয় গবেষকদের একদল বিজ্ঞানী পরীক্ষা করে দেখছেন, নিয়ন্ত্রিত হাইপোক্সিয়া— অর্থাৎ শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমানো— টিউমারের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে কি না। প্রাথমিক ফলাফল যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক বলেই দাবি গবেষক মহলের।
বৈপরীত্য থেকেই গবেষণার সূচনা
গবেষকরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ থেকে এই গবেষণা শুরু করেন। একদিকে, টিউমারের অভ্যন্তরে কম অক্সিজেন থাকলে সাধারণত রোগের পূর্বাভাস খারাপ হয়। অন্যদিকে, উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে— যেখানে স্বাভাবিকভাবেই অক্সিজেনের মাত্রা কম— ক্যানসারজনিত মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম।এই বৈপরীত্যই প্রশ্ন তুলেছিল— নিয়ন্ত্রিতভাবে অক্সিজেন কমালে কি টিউমারের অগ্রগতি থামানো সম্ভব?
ইঁদুরে পরীক্ষা, মিলল স্পষ্ট ইঙ্গিত
গবেষণায় কঠিন টিউমারযুক্ত ইঁদুরদের তিন ধরনের পরিবেশে রাখা হয়েছিল—
২১% অক্সিজেন (স্বাভাবিক বায়ু)
১১% অক্সিজেন (মাঝারি হাইপোক্সিয়া)
৮% অক্সিজেন (তীব্র হাইপোক্সিয়া)
ফলাফলে দেখা যায়, কম অক্সিজেনের পরিবেশে থাকা ইঁদুরদের টিউমারের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়েছে। অর্থাৎ অক্সিজেনের মাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে টিউমারের বিস্তারও কমেছে।
কোষের ভেতরের জৈব রসায়ন কী বলছে?
GENEVA নামের একটি বিশেষ গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ২০টি ভিন্ন ক্যানসার কোষ লাইনের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করেন। একক-কোষ RNA সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে দেখা যায়—
কিছু ক্যানসার কোষ কম অক্সিজেনে টিকে থাকতে সক্ষম হলেও, সামগ্রিকভাবে পিউরিন নিউক্লিওটাইডের মাত্রা কমে যায়।
পিউরিন নিউক্লিওটাইড ডিএনএ গঠন ও কোষ বিভাজনের জন্য অপরিহার্য। এর ঘাটতি ক্যানসার কোষের দ্রুত বিভাজনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
নিউক্লিওটাইড উৎপাদনের দুই পথ ও হাইপোক্সিয়ার প্রভাব
নিউক্লিওটাইড উৎপাদনের দুটি প্রধান পথ রয়েছে—
ডি নভো সংশ্লেষণ পথ (উচ্চ শক্তি নির্ভর)
উদ্ধার পথ (উপলব্ধ নিউক্লিওবেসের উপর নির্ভরশীল)
গবেষণায় দেখা গেছে, হাইপোক্সিয়া শক্তিনির্ভর ডি নভো সংশ্লেষণ পথকে দমন করে। ফলে পিউরিন পুল সঙ্কুচিত হয় এবং টিউমারের বৃদ্ধি সীমিত হতে পারে।
কেমোথেরাপির কার্যকারিতা বাড়াতে পারে?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ— কম অক্সিজেনযুক্ত অবস্থা কেমোথেরাপির ওষুধ জেমসিটাবাইন এবং অ্যান্টি-CTLA4 ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিতে পারে।অর্থাৎ ভবিষ্যতে হাইপোক্সিয়া হয়তো একক চিকিৎসা নয়, বরং বিদ্যমান চিকিৎসার সহায়ক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
‘হাইপোক্সিস্ট্যাট’— সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়
মানবদেহে সরাসরি হাইপোক্সিয়া সৃষ্টি করা জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই গবেষকরা ‘হাইপোক্সিস্ট্যাট’ নামে একটি পরীক্ষামূলক অণু নিয়ে কাজ করছেন।এই ওষুধ হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে অক্সিজেনের আবদ্ধতা বাড়িয়ে শরীরে কম অক্সিজেনের প্রভাব অনুকরণ করতে পারে। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি টিউমারের বৃদ্ধিও ধীর করেছে।
সিস্টেমিক হাইপোক্সিয়া বা শরীরে কম অক্সিজেনের পরিবেশ টিউমারের বৃদ্ধি ধীর করতে পারে— এমনই ইঙ্গিত মিলেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। ইঁদুরের উপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, কম অক্সিজেন পিউরিন নিউক্লিওটাইড উৎপাদন কমিয়ে ক্যানসার কোষ বিভাজনকে ধীর করতে পারে।













