পুজোর মণ্ডপে থিমের বৈচিত্র্য থাকবে, অথচ হারিয়ে যাবে না বাঙালির চেনা আবেগ—এই ভাবনাকেই সঙ্গী করেছে নিউটাউন বিসি ব্লকের দুর্গাপুজো কমিটি। শারদোৎসবের ১৩তম বছরে তাদের নিবেদন অতীতের জনপ্রিয় সংগীতযন্ত্র গ্রামোফোন, যা বাঙালির কাছে ‘কলের গান’ নামেই বেশি পরিচিত। একসময় সংগীতপ্রেমীদের ঘরে ঘরে যার উপস্থিতি ছিল, ডিজিটাল যুগে সেই স্মৃতিই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে মণ্ডপসজ্জায়। ঐতিহ্য, শিল্পকলা ও সাবেকি প্রতিমার মেলবন্ধনে দর্শকদের নজর কাড়ছে এই পুজো।
এ বছরের থিম ‘কলের গান’, ফিরে দেখা বাঙালির সুরেলা অতীত
একসময় গ্রামোফোন ছিল বাঙালির সংগীতচর্চা ও অবসরযাপনের অন্যতম সঙ্গী। পছন্দের গান শোনা থেকে শুরু করে ঘরোয়া আড্ডা—কলের গানকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ সংস্কৃতি। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, এসেছে ডিজিটাল সংগীতের যুগ। সেই পরিবর্তনের পথে অনেকটাই আড়ালে চলে গিয়েছে গ্রামোফোনের স্মৃতি।
নিউটাউন বিসি ব্লকের পুজো কমিটি এ বছর সেই বিস্মৃত ঐতিহ্যকেই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। যান্ত্রিকতার মধ্যেও মানুষের সৃষ্টিশীলতা কীভাবে সংগীতের জন্ম দেয়, সেই ভাবনাই মণ্ডপের মূল উপজীব্য। শব্দ থেকে সুর এবং যন্ত্র থেকে গানে পৌঁছনোর এই যাত্রাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে পুজোর সামগ্রিক আখ্যান।
পুজো কমিটির কর্মকর্তা সৌম্যদীপ মাইতির বক্তব্য অনুযায়ী, এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে কলের গানের সোনালি অতীতকে উদযাপন করার পাশাপাশি মানুষের সৃষ্টিশীল পরিশ্রমকেও সম্মান জানানো হয়েছে।
প্রতিমায় সাবেকি বাঙালিয়ানা, দুর্গা এখানে গণেশজননী
থিমের সঙ্গে প্রতিমার পরিকল্পনাতেও রয়েছে অভিনবত্ব। এ বছরের প্রতিমা পরিকল্পনা ও রূপায়ণের দায়িত্বে রয়েছেন অনিরুদ্ধ ঘোষ, স্বরূপ কুণ্ডু এবং অর্ঘ্যদীপ সাহা।
এখানে দেবী দুর্গাকে চেনা অসুরদলনী রূপের বদলে তুলে ধরা হয়েছে গণেশজননী হিসেবে। প্রতিমার সাজ ও পরিবেশে রয়েছে আটপৌরে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। আধুনিক থিমের সঙ্গে সাবেকি ভাবধারার এই মেলবন্ধন পুজোমণ্ডপে তৈরি করেছে এক অন্যরকম আবহ।
দর্শকদের কাছে এই আয়োজনের বিশেষত্ব হল, থিমের অভিনবত্ব থাকলেও বাঙালির চেনা ধর্মীয় আবেগ ও ঐতিহ্যকে সরিয়ে রাখা হয়নি।
ছোটদের আঁকা ছবি থেকে বাংলার সূচিশিল্প, সজ্জায় শিল্পের ছোঁয়া
নিউটাউন বিসি ব্লকের মণ্ডপসজ্জায় প্রবেশদ্বার থেকে শামিয়ানা—সব জায়গাতেই চোখে পড়ে শিল্পের বৈচিত্র্য। ছোটদের হাতে আঁকা রঙিন ছবি যেমন মণ্ডপকে প্রাণবন্ত করেছে, তেমনই বড়দের তৈরি চারকোল স্কেচ যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।
বিশেষ আকর্ষণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী সূচিকাজের নিদর্শন দিয়ে সাজানো চাঁদোয়া বা শামিয়ানা। লোকশিল্প ও হাতের কাজকে গুরুত্ব দিয়ে মণ্ডপসজ্জায় স্থানীয় শিল্পভাবনাকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
মণ্ডপের পরিকল্পনা ও রূপায়ণে রয়েছেন পিনাকি রায় কর্মকার, অনিরুদ্ধ ঘোষ এবং মহারাজ দাস। তাঁদের সঙ্গে কাজ করেছে একদল খুদে শিল্পীও। বড়দের পরিকল্পনার সঙ্গে ছোটদের সৃজনশীলতার মেলবন্ধনেই মণ্ডপের সাজ পেয়েছে নিজস্ব পরিচয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা ও একসঙ্গে খাওয়াদাওয়ার আনন্দ
নিউটাউন বিসি ব্লকের দুর্গাপুজো শুধু থিম ও প্রতিমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতি বছরের মতো এ বারও পুজোর দিনগুলিতে আয়োজন করা হয়েছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার। এর পাশাপাশি আবাসিকদের জন্য রয়েছে চার দিন একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ।
পুজোর প্রাঙ্গণে বাসিন্দাদের মিলন, ছোটদের অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড উৎসবের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। ফলে এই পুজো শুধু দর্শনীয় মণ্ডপ নয়, আবাসিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও একসঙ্গে উৎসব উদযাপনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
দুর্গাপুজোর মণ্ডপসজ্জায় আধুনিক থিমের পাশাপাশি বাঙালির হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে নিউটাউন বিসি ব্লকের সর্বজনীন দুর্গোৎসব। এ বছর পুজোর মূল আকর্ষণ গ্রামোফোন বা ‘কলের গান’। শব্দ থেকে সুর, যন্ত্র থেকে সংগীত—এই ভাবনাকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। প্রতিমাতেও রয়েছে সাবেকি বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। ছোটদের আঁকা ছবি, চারকোল স্কেচ এবং বাংলার সূচিশিল্পে তৈরি শামিয়ানা পুজোর সজ্জাকে দিয়েছে অন্য মাত্রা।











