ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নরওয়ের রাজধানী অসলোতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ইন্ডিয়া-নর্ডিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ভারত ও উত্তর ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা জোরদারের উদ্দেশ্যে এই শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
এই মঞ্চে ভারত এবং নর্ডিক দেশসমূহ—নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মধ্যে একাধিক বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। আলোচনার প্রধান বিষয়গুলির মধ্যে ছিল জলবায়ু পরিবর্তন, সবুজ শক্তি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগ।
শীর্ষ সম্মেলনের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি নরওয়েসহ অন্যান্য নর্ডিক দেশের প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে সম্মতি হয়।
আলোচনায় বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয় যে, ভারত ও নর্ডিক দেশগুলি যৌথভাবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, বিশেষত জলবায়ু সংকট ও শক্তি রূপান্তরের ক্ষেত্রে সমাধান খুঁজে বের করতে পারে।
এই শীর্ষ সম্মেলনের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল সবুজ শক্তি ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি। উভয় পক্ষ সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, সবুজ হাইড্রোজেন এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকারী প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে।
ভারত ও নর্ডিক দেশগুলি গ্রিন শিপিং এবং ব্লু ইকোনমির মতো ক্ষেত্রেও অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করে।
এই সফরে মহাকাশ খাতও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) এবং নরওয়ের মহাকাশ সংস্থাগুলির মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে সম্মতি হয়।
আর্কটিক গবেষণা, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (Earth Observation Systems)-এর মতো ক্ষেত্রে যৌথ প্রকল্পের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। এর মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।
![]()
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, বিশ্বের সমস্যার সমাধান যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে হওয়া উচিত।
তিনি ইউক্রেন সংঘাত এবং পশ্চিম এশিয়ায় চলমান উত্তেজনার উল্লেখ করে বলেন, ভারত সবসময় শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে থাকবে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও আরও কার্যকর করার জন্য সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, এটি সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে বৈশ্বিক পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তিনি বলেন, যেকোনো রূপের সন্ত্রাসবাদ মানবতার জন্য হুমকি এবং এর বিরুদ্ধে সব দেশকে একযোগে কাজ করতে হবে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোদি ইন্ডিয়া-নরওয়ে বিজনেস অ্যান্ড রিসার্চ সামিটেও অংশগ্রহণ করেন। এই অনুষ্ঠানে নরওয়ের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় শক্তি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, রোবোটিক্স, শিক্ষা, সামুদ্রিক প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনের মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলির মোট বাজারমূল্য প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়।
বৈঠকে ভারত ও নর্ডিক দেশগুলি ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণে সম্মতি জানায় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়।
এছাড়া ভারতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং ১০ লক্ষের বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
উভয় পক্ষ তাদের সম্পর্ককে “গ্রিন স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ” হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। এর আওতায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং সামুদ্রিক অর্থনীতির মতো ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়।
একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং মৎস্য খাতেও যৌথ প্রচেষ্টা জোরদারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সফর চলাকালে নরওয়ের রাজা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘গ্র্যান্ড ক্রস অব দ্য রয়্যাল নরওয়েজিয়ান অর্ডার অব মেরিট’ প্রদান করেন।
এটি ভারত ও নরওয়ের মধ্যে শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।








