নয়াদিল্লি: পরিবারের কোনও অবিবাহিত সদস্য হঠাৎ উইল না করে মারা গেলে তাঁর বাড়ি, জমি, ব্যাঙ্কের টাকা বা অন্যান্য সম্পত্তির মালিক কে হবেন, তা নিয়ে অনেক সময় পরিবারের মধ্যেই তৈরি হয় বিভ্রান্তি। অনেকের ধারণা, যেহেতু মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা সন্তান নেই, তাই তাঁর সম্পত্তি সরাসরি ভাই-বোনেরা পেয়ে যাবেন। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। উত্তরাধিকারীর ক্রম, মৃত ব্যক্তির ধর্ম এবং সম্পত্তির ধরন—একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে সম্পত্তি কার কাছে যাবে।
অবিবাহিত হলেই কি সম্পত্তি ভাই-বোন পাবেন?
না, এমন কোনও সাধারণ নিয়ম নেই। ধরুন, কোনও হিন্দু ব্যক্তি অবিবাহিত অবস্থায় মারা গেলেন এবং কোনও উইলও করে যাননি। সেক্ষেত্রে তাঁর সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬ অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের নির্দিষ্ট ক্রম বিবেচনা করা হয়।প্রথমেই দেখতে হবে Class I heirs, অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কেউ জীবিত রয়েছেন কি না। স্ত্রী, সন্তান এবং মা এই শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকারী। এঁদের মধ্যে যোগ্য উত্তরাধিকারী থাকলে সাধারণভাবে সম্পত্তি প্রথমে তাঁদের মধ্যেই বণ্টিত হয়।
বাবা জীবিত থাকলে কী হবে?
এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা রয়েছে। কোনও অবিবাহিত হিন্দু ব্যক্তি মারা গেলেন এবং তাঁর স্ত্রী বা সন্তান নেই—এমন পরিস্থিতিতেও ভাই-বোন যে সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবেন, তা নয়।যদি মা না থাকেন কিন্তু বাবা জীবিত থাকেন, তাহলে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের Class II তালিকায় বাবার অবস্থান ভাই-বোনের আগে। ফলে ভাই-বোনের দাবি কার্যকর হওয়ার আগে বাবার উত্তরাধিকার-অধিকার বিবেচনা করতে হবে।অর্থাৎ, “অবিবাহিত ব্যক্তি মারা গেলেই সম্পত্তি ভাই-বোন পাবে”—এই ধারণা ঠিক নয়।
কখন ভাই-বোন সম্পত্তির অধিকার পেতে পারেন?
প্রথম শ্রেণির কোনও উত্তরাধিকারী না থাকলে Class II বা দ্বিতীয় শ্রেণির উত্তরাধিকারীদের দিকে যেতে হয়। এখানেও আবার নির্দিষ্ট অগ্রাধিকারের তালিকা রয়েছে।যদি সংশ্লিষ্ট উচ্চতর শ্রেণির উত্তরাধিকারী জীবিত থাকেন, তাহলে তার নিচের ক্রমে থাকা উত্তরাধিকারীরা সাধারণত একই সময়ে সম্পত্তির অধিকার পান না।তাই অবিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভাই-বোনের অধিকার নির্ধারণ করতে শুধু “স্ত্রী বা সন্তান নেই” দেখলেই হবে না। বাবা-মা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য উত্তরাধিকারীর অবস্থানও যাচাই করতে হবে।
বাবা-মা কেউ না থাকলে ভাই-বোনের কী অধিকার?
ধরা যাক, মৃত ব্যক্তি অবিবাহিত। তাঁর কোনও স্ত্রী বা সন্তান নেই। বাবা-মাও কেউ জীবিত নেই। এই পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য আইনের অধীনে ভাই-বোন উত্তরাধিকারী হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।একাধিক যোগ্য ভাই-বোন থাকলে কোনও একজন ভাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো বাড়ি বা জমির মালিক হয়ে যাবেন না। উত্তরাধিকার আইনের নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তির অংশ নির্ধারিত হবে।তবে সম্পত্তিটি স্ব-অর্জিত নাকি পৈতৃক বা যৌথ পারিবারিক সম্পত্তি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
স্ব-অর্জিত আর পৈতৃক সম্পত্তি এক নয়
মৃত ব্যক্তির নিজের উপার্জনে কেনা বাড়ি, জমি বা অন্য সম্পত্তি এবং যৌথ পারিবারিক সম্পত্তিতে তাঁর অংশ—দুই বিষয়কে একভাবে দেখা যায় না।স্ব-অর্জিত সম্পত্তির ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী তাঁর অংশ বণ্টিত হয়। অন্যদিকে যৌথ পারিবারিক বা পৈতৃক সম্পত্তির ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির নিজস্ব অংশ কতটা ছিল, সেটিও আগে নির্ধারণ করতে হতে পারে।তাই শুধু সম্পত্তিটি মৃত ব্যক্তির নামে ছিল বলেই পুরো সম্পত্তির উত্তরাধিকার একই নিয়মে হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
২০০৫ সালের সংশোধনের পর মেয়েদের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ
হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে ২০০৫ সালের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের পর যৌথ হিন্দু পারিবারিক সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার আরও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে পরিবারের কোনও অবিবাহিত সদস্যের মৃত্যুর ক্ষেত্রে পৈতৃক বা যৌথ সম্পত্তি থাকলে উত্তরাধিকার নির্ধারণ আরও নির্দিষ্ট আইনি হিসাবের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।এই কারণে সম্পত্তির দলিল, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সম্পত্তিতে মৃত ব্যক্তির প্রকৃত অংশ—সবকিছু যাচাই করা জরুরি।
ভাই-বোনেরা সম্পত্তি পেলে কী সমস্যা হতে পারে?
একাধিক উত্তরাধিকারী একই সম্পত্তির অংশীদার হলে সম্পত্তিটি সঙ্গে সঙ্গে আলাদা আলাদা বাড়ি বা জমির টুকরোয় ভাগ হয়ে যায় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যেকের অংশ নির্ধারিত হলেও সম্পত্তির ব্যবহার বা মালিকানা যৌথ অবস্থায় থাকতে পারে।এরপর সমস্যা তৈরি হতে পারে বাড়ি বিক্রি, ভাড়া দেওয়া, মেরামতির খরচ, সম্পত্তি কর বা সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে। একজন বিক্রি করতে চাইছেন, অন্যজন সম্পত্তি রেখে দিতে চাইছেন—এমন মতবিরোধ থেকেও পারিবারিক বিবাদ তৈরি হতে পারে।
সম্পত্তির নামজারির সময় কী নথি লাগতে পারে?
উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তির সরকারি নথিতে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে বিভিন্ন নথির প্রয়োজন হতে পারে। যেমন—
মৃত ব্যক্তির মৃত্যু শংসাপত্র
উত্তরাধিকারী বা পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কের প্রমাণ
সম্পত্তির মূল দলিল ও অন্যান্য মালিকানা নথি
প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তরাধিকার সংক্রান্ত শংসাপত্র বা অন্যান্য আইনগত নথি
তবে ঠিক কোন নথি প্রয়োজন হবে, তা সম্পত্তির ধরন ও সংশ্লিষ্ট রাজ্যের প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করতে পারে।
ব্যাঙ্কের টাকা আর বাড়ি-জমির নিয়ম কি একই?
সব সম্পত্তির ক্ষেত্রে একই নথি বা একই প্রক্রিয়া প্রযোজ্য নয়। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, শেয়ার বা অন্যান্য আর্থিক সম্পদের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নথির প্রয়োজন হতে পারে। আবার বাড়ি বা জমির মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আলাদা রেজিস্ট্রেশন, নামজারি বা অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়া থাকতে পারে।তাই সম্পত্তির ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া জেনে নেওয়াই নিরাপদ।
উইল করে গেলে অনেক জটিলতা কমতে পারে
সম্পত্তি নিয়ে ভবিষ্যতে পরিবারের মধ্যে বিবাদ এড়াতে জীবদ্দশায় সঠিকভাবে উইল তৈরি করে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। উইলে নিজের সম্পত্তি মৃত্যুর পর কীভাবে বণ্টন করতে চান, তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা যায়তবে উইল তৈরির ক্ষেত্রেও আইনগত নিয়ম মেনে চলা জরুরি। বিশেষ করে বড় সম্পত্তি, পৈতৃক সম্পত্তি বা একাধিক উত্তরাধিকারী থাকলে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উপযোগী।
কোনও অবিবাহিত ব্যক্তি উইল না করে মারা গেলে তাঁর সম্পত্তি সরাসরি ভাই-বোনের হাতে চলে যায় না। মৃত ব্যক্তির ধর্ম, প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন এবং জীবিত উত্তরাধিকারীদের ক্রম অনুযায়ী সম্পত্তির অধিকার নির্ধারিত হয়। হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে বাবা-মা, ভাই-বোনসহ বিভিন্ন উত্তরাধিকারীর অগ্রাধিকার কী, জেনে নিন।













