শরতের শেষ, দিনের আলো কমে গেলে অনেকেই মনখারাপ, ক্লান্তি, উদ্যমহীনতার মতো অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যান। কারও ক্ষেত্রে এটি সাময়িক হলেও, বহু মানুষের জীবনে এটি রূপ নেয় চক্রাকার অবসাদে—যা প্রতি বছর একই সময়ে ফিরে আসে। চিকিৎসকেরা এটিকে বলেন Seasonal Affective Disorder বা ঋতুগত আবেগজনিত ব্যাধি। প্রাকৃতিক আলো কমে যাওয়ার সঙ্গে শরীরে সেরোটোনিন–মেলাটোনিনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়াই এর প্রধান কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ঋতু বদলের অজান্তে মনেও বদল—কেন বাড়ে SAD?
ঋতুর পালাবদলের সময়ে দিন ছোট হয়, সূর্যালোক কমে। শরীরের ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ নামে পরিচিত অভ্যন্তরীণ ঘড়িটি এই আলোঘাটতির কারণে তাল কেটে যায়। সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডঃ দেবদীপ রায় চৌধুরির মতে, সূর্যালোক কম থাকলে মেজাজ নিয়ন্ত্রণকারী সেরোটোনিন কমে যায় এবং মেলাটোনিন বেড়ে যায়। ফলে বাড়ে অলসতা, ঘুমঘুম ভাব ও আবেগের অস্থিরতা।এই কারণে SAD-এ আক্রান্ত ব্যক্তিটি প্রায়শই নিজেকে সামাজিকভাবে গুটিয়ে ফেলেন, কাজকর্মে আগ্রহ হারান এবং অতিরিক্ত ঘুমাতেন কিংবা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়।
![]()
হরমোনের পরিবর্তনও বড় কারণ
শীতকালে উজ্জ্বল আলো কমে যাওয়ায় সেরোটোনিনের উৎপাদন বাধাপ্রাপ্ত হয়। একই সঙ্গে মেলাটোনিন নিঃসরণ বেড়ে যায়—যা ঘুমের চক্রে ব্যাঘাত এনে সারাদিন অলস করে তোলে। চিকিৎসকেরা জানান, এই জৈব রাসায়নিক পরিবর্তনগুলি সরাসরি মেজাজ, মনোযোগ, শক্তি ও মানসিক স্থিতিস্থাপকতাকে প্রভাবিত করে।
মনোসামাজিক প্রভাব—অন্ধকার দিন, দূরে সরে যাওয়া সম্পর্ক
শীতের সময়ে বাইরে বেরোনো কমে যায়, কাজের চাপ বাড়ে, সামাজিক যোগাযোগ হ্রাস পায়। প্রকৃতির সংস্পর্শ না-থাকা ও একাকিত্ব অনুভব SAD-এর লক্ষণকে আরও তীব্র করে তোলে। যাঁদের আগে থেকেই মানসিক চাপ বা ট্রমার ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা দ্রুত বাড়ে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
![]()
কীভাবে বুঝবেন আপনি SAD-এ ভুগছেন? প্রধান লক্ষণ
সারাদিন ক্লান্তি, ঘুমঘুম ভাব
আগের মতো কাজের উৎসাহ না থাকা
সামাজিকভাবে নিজেকে আলাদা করে ফেলা
অতিরিক্ত ঘুম (হাইপারসোমনিয়া)
খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা পরিবর্তন, বিশেষত মিষ্টি–কার্বোহাইড্রেট
ক্রমাগত মনখারাপ, বিরক্তি
কোনও কিছুতেই আগের মতো আনন্দ না পাওয়া
লক্ষণগুলি ২–৩ সপ্তাহ ধরে থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসা: আলো–থেরাপি থেকে CBT—কী বলছেন বিশেষজ্ঞ?
SAD-এর চিকিৎসায় সবচেয়ে সফল দুটি উপায় হলো—
![]()
CBT (Cognitive Behavioral Therapy)
শীতকালে বাড়তে থাকা নেতিবাচক ভাবনা চিহ্নিত করা, আচরণগত রুটিন তৈরি করা এবং মনকে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে।
লাইট থেরাপি
ঘুম থেকে ওঠার পর ১০,০০০-লাক্স সাদা আলোয় বসা। এটি শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দকে পুনরুদ্ধার করে এবং মেজাজ উন্নত করে।
ঔষধ (যদি প্রয়োজন হয়)
গুরুতর ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা SSRI গ্রুপের অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট দিতে পারেন। তবে ওষুধ সবসময় মনোসামাজিক সহায়তার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে অনেকেই মেজাজ, শক্তি ও ঘুমের ছন্দে সূক্ষ্ম পরিবর্তন অনুভব করেন। কিন্তু কারও ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন এতটাই তীব্র হয় যে তা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে। শরতের শেষ থেকে শীতকালেই বেশি দেখা দেয় Seasonal Affective Disorder (SAD)। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, এর মূল কারণ আলোহীনতা, হরমোনের পরিবর্তন ও মানসিক চাপ। সময়মতো চিকিৎসা নিলে এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।









