শান্তিপুরের রথে জগন্নাথ নন, মূল আকর্ষণ গোঁফওয়ালা ‘রঘুনাথ’! আড়াইশো বছরের ঐতিহ্যে বড়গোস্বামী বাড়িতে ভক্তদের ঢল

নদিয়ার শান্তিপুরের বড়গোস্বামী বাড়ির ২৫০ বছরেরও বেশি পুরনো রথযাত্রায় জগন্নাথের পাশাপাশি গোঁফওয়ালা রঘুনাথ বিগ্রহই মূল আকর্ষণ। জেনে নিন এই বিরল ঐতিহ্য, বিশেষ ভোগ ও মেলার ইতিহাস।

বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে রথযাত্রা মানেই জগন্নাথদেবের রথ। কিন্তু নদিয়ার শান্তিপুরে সেই চিরচেনা ছবির ব্যতিক্রম দেখা যায়। এখানে রথের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন ‘রঘুনাথ’—রামচন্দ্রের এক অনন্য দারুমূর্তি, যার মুখে মোটা গোঁফ, পরনে ধুতি ও চাদর। শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহ্য আজও সমান আকর্ষণ ধরে রেখেছে।

শান্তিপুরের রথে জগন্নাথ নন, মূল আকর্ষণ গোঁফওয়ালা ‘রঘুনাথ’! আড়াইশো বছরের ঐতিহ্যে বড়গোস্বামী বাড়িতে ভক্তদের ঢল
জগন্নাথ নয়, রথের মূল আকর্ষণ রঘুনাথ

শান্তিপুরের একাধিক গোস্বামী পরিবারের রথে প্রধান দেবতা হিসেবে বিরাজ করেন রঘুনাথ। এই বিগ্রহ প্রচলিত রামচন্দ্রের মূর্তির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

সবুজ রঙের কাঠের এই মূর্তির—

মুখে মোটা গোঁফ,

পরনে ধুতি ও চাদর,

পদ্মাসনে আসীন বাবু-সুলভ রূপ।

রঘুনাথের পাশেই জগন্নাথদেবের বিগ্রহ থাকলেও ভক্তদের মূল আকর্ষণ থাকে এই বিরল রূপের রঘুনাথকে ঘিরেই।

আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরনো বড়গোস্বামী বাড়ির রথ

শান্তিপুরের বড়গোস্বামী বাড়ির রথযাত্রার ইতিহাস প্রায় ২৫০ বছরেরও বেশি পুরনো।পরিবারের সদস্যদের মতে, অতীতে রথটি ছিল অনেক বড়। সেই বিশাল রথে ছোট আকারের জগন্নাথ বিগ্রহ যথাযথভাবে মানিয়ে যেত না। তাই জগন্নাথের পাশাপাশি বড় আকারের রঘুনাথের কাঠের বিগ্রহ রথে তোলার প্রথা চালু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রঘুনাথই হয়ে ওঠেন এই রথযাত্রার প্রধান আকর্ষণ।

শান্তিপুরের রথে জগন্নাথ নন, মূল আকর্ষণ গোঁফওয়ালা ‘রঘুনাথ’! আড়াইশো বছরের ঐতিহ্যে বড়গোস্বামী বাড়িতে ভক্তদের ঢল
রঘুনাথ বিগ্রহের রয়েছে বিশেষ ইতিহাস

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, এই প্রাচীন কাঠের বিগ্রহ একসময় স্যার অতুলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের কাছে ছিল। পরে সেটি বড়গোস্বামী বাড়িতে আনা হয় এবং তখন থেকেই এই বিশেষ ঐতিহ্যের সূচনা।রথের দিন প্রথমে হাওদায় করে রঘুনাথকে মন্দির থেকে রথের সামনে আনা হয়। বিশেষ পূজার পর তাঁকে রথে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বদলেছে রথে বিগ্রহ তোলার পদ্ধতি

আগে বহু ভক্ত একসঙ্গে কাঁধে করে ভারী কাঠের বিগ্রহ রথে তুলতেন।

বর্তমানে লোকবল কমে যাওয়ায় নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে চেন ও পুলির সাহায্যে রঘুনাথের বিগ্রহ রথে তোলা হয়।

রথ উপলক্ষে বিশেষ ‘দেওড়াভোগ’

শান্তিপুরের রথযাত্রায় ভোগেরও রয়েছে বিশেষ ঐতিহ্য।

উল্টো রথের আগের রাতে ‘দেওড়াভোগ’-এ নিবেদন করা হয়—

সাদা ভাত

কলমিশাক

খিচুড়ি

বিভিন্ন নিরামিষ তরকারি

ভাজা

দই

পায়েস

এই ভোগকে ঘিরেও ভক্তদের মধ্যে আলাদা উৎসাহ দেখা যায়।

শান্তিপুরের রথে জগন্নাথ নন, মূল আকর্ষণ গোঁফওয়ালা ‘রঘুনাথ’! আড়াইশো বছরের ঐতিহ্যে বড়গোস্বামী বাড়িতে ভক্তদের ঢল
রথের সঙ্গে জমে ওঠে ঐতিহ্যবাহী মেলা

রথযাত্রা উপলক্ষে শান্তিপুরে দুটি বড় মেলা বসে।একটি বড়গোস্বামী বাড়ির সংলগ্ন মাঠে এবং অন্যটি রথতলায়। বিশেষ করে বড়গোস্বামী পাড়ার মেলায় আজও সাবেক বাংলার আবহ অটুট রয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং গ্রামীণ মেলার সমন্বয়ে এই উৎসব প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটায়।

শান্তিপুরের রথে জগন্নাথ নন, মূল আকর্ষণ গোঁফওয়ালা ‘রঘুনাথ’! আড়াইশো বছরের ঐতিহ্যে বড়গোস্বামী বাড়িতে ভক্তদের ঢল
নদিয়ার শান্তিপুরের রথযাত্রা বাংলার অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় উৎসবগুলির একটি। তবে এখানকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, রথের মূল আকর্ষণ জগন্নাথ নন, বরং ধুতি-চাদর পরা, গোঁফওয়ালা ‘রঘুনাথ’ বিগ্রহ। বড়গোস্বামী বাড়ির প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য দেখতে প্রতিবছরই উপচে পড়ে ভক্তদের ভিড়।

Leave a comment