সিকিমের নামচি জেলায় নির্মাণাধীন তিস্তা স্টেজ-৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে ভূমিধসের ঘটনায় ২৫ জন শ্রমিক আটকে পড়েন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি পাঁচ শ্রমিক এখনও সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে রয়েছেন। মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি এবং বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও তা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুর প্রায় ৩টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক ভূমিধসের ফলে সুড়ঙ্গের একটি অংশে বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথর ধসে পড়ে। এর ফলে ভিতরে কর্মরত একাধিক শ্রমিক বেরিয়ে আসতে পারেননি।
দুর্ঘটনাটি তিস্তা স্টেজ-৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অংশ অ্যাডিট-৩ সুড়ঙ্গে ঘটে। প্রকল্পটি নামচি জেলার সমরডুং-ঝোলুংয় এলাকায় নির্মাণাধীন। বেসরকারি নির্মাণ সংস্থা পটেল ইঞ্জিনিয়ারিং সুড়ঙ্গটির নির্মাণকাজ পরিচালনা করছিল। ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি ফেস-৪বি সেকশনে অবস্থিত, যেখানে ভূমিধসের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও মাটি ধসে পড়ে চলাচলের পথ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একই এলাকায় মিথেন গ্যাস জমে থাকার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সুড়ঙ্গের ভিতরে মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মিথেন নিজে বিষাক্ত গ্যাস নয়, তবে বন্ধ স্থানে এটি অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমিয়ে দেয়। এর ফলে শ্বাসরোধ, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বেড়ে যায়। উদ্ধারকারী দলের কয়েকজন সদস্য অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে সুড়ঙ্গে প্রবেশের সময় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রশাসন বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী ব্লোয়ার এবং বিশেষ ভেন্টিলেশন পাইপের মাধ্যমে সুড়ঙ্গে নিয়মিত বিশুদ্ধ বাতাস সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে, যাতে গ্যাসের প্রভাব কমানো যায়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যেসব পাঁচ শ্রমিকের কাছে এখনও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, তারা সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ থেকে প্রায় ১.৫ কিলোমিটার ভিতরে আটকে রয়েছেন। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে পথ তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সুড়ঙ্গের অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। অভিযানে আট সদস্যের বিশেষ দল পর্যায়ক্রমে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করছে। প্রত্যেক সদস্য অক্সিজেন সিলিন্ডারের সাহায্যে ভিতরে প্রবেশ করছেন, তবে একটি সিলিন্ডার প্রায় ৪০ মিনিট পর্যন্ত কার্যকর থাকায় নির্ধারিত সময়ের আগেই দলকে ফিরে আসতে হচ্ছে। এর ফলে উদ্ধারকাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।
![]()
সুড়ঙ্গের ভিতরে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরাতে ছোট লোডার, রোবোটিক যন্ত্র এবং বিশেষ খনন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি সুড়ঙ্গের ছাদ স্থিতিশীল রাখতে শটক্রিট এবং রক-বোল্টিং প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে, যাতে আরও পাথর ধসে পড়ার ঝুঁকি কমানো যায়। বিশেষজ্ঞরা ধারাবাহিকভাবে সুড়ঙ্গের কাঠামোগত অবস্থা মূল্যায়ন করছেন।
দুর্ঘটনার পর সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলির ভিতরে পৌঁছাতে উল্লেখযোগ্য সমস্যা হয়েছে। সুড়ঙ্গের অধিকাংশ অংশকে নিরাপদ বলা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত অংশে অক্সিজেনের ঘাটতি, গ্যাসের উপস্থিতি এবং ধারাবাহিকভাবে ধ্বংসাবশেষ পড়তে থাকায় পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জপূর্ণ রয়েছে। উদ্ধারকারী সংস্থাগুলি আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অভিযান কখন সফল হতে পারে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি।
ভূ-প্রযুক্তি ও খনন বিশেষজ্ঞদের মতে, মিথেন গ্যাস বর্ণহীন ও গন্ধহীন। এটি যদি বন্ধ স্থানে জমা হয়, তবে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। এমন পরিবেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন এবং সময়মতো অক্সিজেন না পেলে প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়া মিথেন গ্যাস আগুন বা স্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে এলে বিস্ফোরণের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। এই কারণে সুড়ঙ্গের ভিতরে সব যন্ত্রপাতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান সাধারণ দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রমের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। সীমিত স্থান, কম দৃশ্যমানতা, ক্রমাগত ধ্বংসাবশেষ পড়া, গ্যাসের উপস্থিতি এবং অক্সিজেনের ঘাটতির মতো পরিস্থিতি উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তাই উদ্ধারকারী দলকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হয় এবং প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কোনও ধরনের তাড়াহুড়ো উদ্ধারকর্মীদের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এই দুর্ঘটনার পর নির্মাণ প্রকল্পগুলিতে নিরাপত্তা মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে নির্মিত সুড়ঙ্গগুলিতে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকির ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং কার্যকর গ্যাস মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রশাসন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তে ভূমিধস কী পরিস্থিতিতে ঘটেছে এবং নির্মাণস্থলে প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করা হচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
বর্তমানে উদ্ধার অভিযানের মূল লক্ষ্য সুড়ঙ্গে আটকে থাকা বাকি পাঁচ শ্রমিকের কাছে নিরাপদে পৌঁছানো। উদ্ধারকারী সংস্থাগুলি আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।










