আরব সাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে মন্দিরের পাথুরে প্রাচীরে। দূরে শোনা যায় শঙ্খধ্বনি, ভেসে আসে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি। হাজার বছরের ইতিহাস, লুণ্ঠন, ধ্বংস আর পুনর্নির্মাণের সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে গুজরাটের সোমনাথ মন্দির। ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম বলে পরিচিত এই মন্দির ২০২৬ সালে স্পর্শ করল তার ১০০০ বছরের ঐতিহাসিক অধ্যায়।
ইতিহাসের পাতায় অমর সোমনাথ
১০২৬ সালে প্রথমবার আক্রমণের মুখে পড়েছিল সোমনাথ মন্দির। এরপর বহুবার বিদেশি আক্রমণকারীদের হাতে ধ্বংস হয়েছে এই দেবালয়। কিন্তু প্রতিবারই নতুন করে গড়ে উঠেছে ভারতের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে। সেই কারণেই সোমনাথ শুধু একটি মন্দির নয়, এটি ভারতীয় সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের চিহ্ন।স্বাধীনতার পরে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের উদ্যোগে শুরু হয় মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজ। ১৯৫১ সালে নতুন রূপে উদ্বোধন হয় বর্তমান সোমনাথ মন্দিরের। রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বলেছিলেন, “ধ্বংসের চেয়ে সৃষ্টি অনেক বেশি শক্তিশালী।
৭৫ বছরের প্ল্যাটিনাম জয়ন্তীতে বিশেষ আয়োজন
২০২৬ সালে সোমনাথ মন্দিরের আধুনিক পুনর্নির্মাণের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হয়েছে বিশেষ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে ভাষণ শুরু করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে স্বাধীন ভারতের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গও।প্রধানমন্ত্রীর মতে, সোমনাথের পুনর্নির্মাণ কেবল ধর্মীয় উদ্যোগ ছিল না, বরং স্বাধীন ভারতের আত্মমর্যাদার প্রতীক।
স্থাপত্যে প্রাচীন ভারতের গৌরব
চালুক্য স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত বর্তমান সোমনাথ মন্দির শিল্পকলার এক অনন্য নিদর্শন। বিশাল গর্ভগৃহ, সভা মণ্ডপ এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ মন্দিরকে দিয়েছে রাজকীয় সৌন্দর্য। মন্দিরের সামনেই বিস্তীর্ণ আরব সাগর এই স্থানকে আরও রহস্যময় ও আধ্যাত্মিক করে তোলে।সূর্যাস্তের সময় মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের গর্জনের সঙ্গে ঘণ্টাধ্বনি মিশে এক অন্য অনুভূতির জন্ম দেয়।
আরতি ও লাইট-অ্যান্ড-সাউন্ড শো পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ
প্রতিদিন সকাল ৭টা, দুপুর ১২টা এবং সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ আরতি। সেই সময় ভক্তদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে ওঠে গোটা মন্দির চত্বর।এছাড়া রাত ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলে জনপ্রিয় লাইট-অ্যান্ড-সাউন্ড শো। আলোর মাধ্যমে তুলে ধরা হয় সোমনাথের হাজার বছরের ইতিহাস। সমুদ্রের ধারে সেই অভিজ্ঞতা পর্যটকদের মনে আলাদা ছাপ ফেলে।
সোমনাথ গেলে আর কোথায় ঘুরবেন?
সোমনাথ মন্দিরের কাছেই রয়েছে পবিত্র ত্রিবেণী সঙ্গম। এছাড়া ভালকা তীর্থ, ভেরাভাল সৈকত এবং দ্বারকা মন্দিরও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।বিশেষ করে ভালকা তীর্থকে ঘিরে রয়েছে শ্রীকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণের পুরাণকাহিনি, যা ভক্তদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে পৌঁছবেন সোমনাথ?
ট্রেনপথে ভেরাভাল এবং সোমনাথ স্টেশন সবচেয়ে সুবিধাজনক। কলকাতা, আহমেদাবাদ, রাজকোট-সহ বিভিন্ন শহর থেকে রেল যোগাযোগ রয়েছে।বিমানপথে যেতে চাইলে নিকটতম বিমানবন্দর দিউ, যা মন্দির থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে। এছাড়া সড়কপথেও গুজরাটের বিভিন্ন শহর থেকে বাস ও গাড়ির পরিষেবা পাওয়া যায়।
থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে
সোমনাথে সব ধরনের বাজেটের হোটেল পাওয়া যায়। পাশাপাশি সোমনাথ ট্রাস্টের অতিথিশালাও ভক্তদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ১,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকার মধ্যেই পরিষ্কার ও আরামদায়ক ঘর বুক করা সম্ভব।তবে উৎসবের মরশুমে ভিড় অত্যন্ত বেশি হয়, তাই আগে থেকে বুকিং করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
গুজরাটের প্রভাস পাটনে অবস্থিত সোমনাথ মন্দির শুধু একটি তীর্থস্থান নয়, এটি ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পুনর্জাগরণের প্রতীক। একাধিকবার ধ্বংসের পরও নতুন করে উঠে দাঁড়িয়েছে এই প্রাচীন জ্যোতির্লিঙ্গ। ২০২৬ সালে ১০০০ বছরের ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সোমনাথ। কীভাবে পৌঁছবেন, কোথায় থাকবেন, কী কী দেখবেন— রইল সম্পূর্ণ ভ্রমণ গাইড।













