পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী শহরকে অনেকেই চেনেন ‘কালীর শহর’ নামে। কার্তিকী অমাবস্যা এলেই শহরজুড়ে শুরু হয় কালীপুজোর প্রস্তুতি। আর এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ কয়েকশো বছরের প্রাচীন মাইত কালীমায়ের পুজো। শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, এক মারাঠা সেনাপতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্যময় লোককথাও এই পুজোকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।
ভাস্কর পণ্ডিতের সোনামুখী আগমন ঘিরে প্রচলিত কাহিনি
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ মারাঠা সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত লুটপাটের উদ্দেশ্যে সোনামুখীতে এসেছিলেন। সেই সময় মাইত কালীমায়ের বর্তমান মন্দিরের জায়গায় কোনও বড় মন্দির ছিল না। ছিল একটি ছোট্ট তালপাতার কুটির। নির্জন পরিবেশের কারণে দিনের বেলাতেও অনেকে সেই স্থানে যেতে সাহস পেতেন না। সেই কুটিরেই পূজিত হতেন দেবী কালী।
খাঁড়া আটকে যেতেই দৃষ্টিশক্তি হারান সেনাপতি!
প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, একদিন মন্দিরের এক বৃদ্ধ সেবাইত দেবীর সামনে প্রণাম করছিলেন। সেই সময় ভাস্কর পণ্ডিত তাঁকে খাঁড়া দিয়ে আঘাত করতে উদ্যত হন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর হাতের খাঁড়া আটকে যায়। একই সঙ্গে তিনি দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলেন বলে লোককথায় বর্ণিত রয়েছে।পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বৃদ্ধ সেবাইত দেবীর ঘটের জল সেনাপতির শরীরে ছিটিয়ে দেন। কথিত আছে, এর পরেই ফিরে পান তাঁর স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি। এই ঘটনার পর দেবীর অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠেন ভাস্কর পণ্ডিত।
‘মাই তো কালি হ্যায়’ থেকেই কি মাইত কালী নাম?
দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার পর ভাস্কর পণ্ডিত বৃদ্ধ সেবাইতের কাছে জানতে চান, ওই কুটিরে কোন দেবী অধিষ্ঠান করছেন। সেবাইত জানান, তিনি মা কালী।মারাঠি ভাষায় দেবীর পরিচয় শুনে সেনাপতি নাকি বলে ওঠেন, ‘মাই তো কালি হ্যায়’। স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তাঁর মুখের এই কথার উচ্চারণ থেকেই দেবীর নাম হয় ‘মাইত কালী’। শুধু তাই নয়, নিজের খাঁড়াগুলিও দেবীর পুজোর জন্য মন্দিরে রেখে যান তিনি। যদিও এই কাহিনির ঐতিহাসিক প্রমাণের বদলে এটি মূলত দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্থানীয় জনশ্রুতি।
পুজোর বিশেষ আকর্ষণ ঘটের জল ও নরনারায়ণ সেবা
কার্তিকী অমাবস্যায় শুরু হয় মাইত কালীমায়ের পুজো। এই উপলক্ষে সোনামুখীতে দূরদূরান্ত থেকে বহু ভক্তের সমাগম হয়। পুজোর প্রথম দিন ঘটের নিরঞ্জন করা হয়। সেই ঘটের জলে স্নান করতে আসেন অসংখ্য মানুষ। ভক্তদের বিশ্বাস, এই আচার পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।পুজোর তৃতীয় দিনে আয়োজন করা হয় নরনারায়ণ সেবার। প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ধর্মীয় রীতির পাশাপাশি এই বিশাল আয়োজনও পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব।
৪২ জন বেহারার কাঁধে শহর পরিক্রমা করেন মা
মাইত কালীপুজোর আরও একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব হল নগর পরিক্রমা। পুজোর চতুর্থ দিনে হয় শহর পরিক্রমা। পঞ্চম দিনে পল্লিবাসীরা হাতে করে মাকে মন্দির প্রাঙ্গণে নামিয়ে আনেন।এই পর্বে কোচডিহি থেকে আসেন ৪২ জন বেহারা। তাঁরা খালি পায়ে কাঁধে করে দেবীকে গোটা সোনামুখী শহর ঘোরান। পরের দিন সম্পন্ন হয় বিসর্জন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতি আজও পুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
বাঁকুড়ার সোনামুখী শহরের ঐতিহ্যবাহী মাইত কালীপুজোকে ঘিরে রয়েছে এক বিস্ময়কর জনশ্রুতি। কথিত আছে, ১৭৪২ সালে মারাঠা সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এই পুজোর ইতিহাস। দেবীর অলৌকিক ক্ষমতার সামনে নতিস্বীকার করে তাঁর মুখে উচ্চারিত ‘মাই তো কালি হ্যায়’ কথাটি থেকেই নাকি মায়ের নাম হয় মাইত কালী। আজও নানা আচার-অনুষ্ঠান ও বিপুল ভক্তসমাগমের মধ্যে দিয়ে পালিত হয় এই পুজো।











