মাতৃত্বের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। কেউ তাড়াতাড়ি সন্তান নিতে চান, আবার কেউ কর্মজীবন, পড়াশোনা কিংবা ব্যক্তিগত কারণে মাতৃত্বের পরিকল্পনা পিছিয়ে দেন। ভবিষ্যতে সন্তানধারণের সম্ভাবনা কিছুটা ধরে রাখার জন্য অনেকেই এখন ডিম্বাণু সংরক্ষণের পথ বেছে নিচ্ছেন। সম্প্রতি অভিনেত্রী তানিশা মুখার্জি জানিয়েছেন, ৩৯ বছর বয়সে তিনি এগ ফ্রিজিং করিয়েছেন। কিন্তু এই পদ্ধতি করানোর আদর্শ বয়স কোনটি? বয়স বাড়লে কি ঝুঁকি বাড়ে? বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য জেনে নিন।
৩৯ বছর বয়সে কেন ডিম্বাণু সংরক্ষণ করালেন তানিশা?
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তানিশা মুখার্জি জানিয়েছেন, ৩৩ বছর বয়সেই তিনি ডিম্বাণু সংরক্ষণের কথা ভেবেছিলেন। সেই সময় চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শও করেন। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শে তখনই এগ ফ্রিজিং করাননি। পরে ৩৯ বছর বয়সে এই সিদ্ধান্ত নেন তিনি।তানিশার কথায়, সন্তান না থাকলেই কোনও নারীর জীবন অসম্পূর্ণ হয়ে যায় না। সন্তান দত্তক নেওয়ার মতো বিকল্পও রয়েছে। তাঁর মতে, বিয়ে করা বা কোনও সম্পর্কে থাকাই একজন নারীর পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না।অভিনেত্রী আরও জানিয়েছেন, তাঁর মা তনুজা সব সময় তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তানিশার এই বক্তব্যের পরেই মাতৃত্ব এবং প্রজননক্ষমতা সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এগ ফ্রিজিং কী এবং কেন করানো হয়?
এগ ফ্রিজিং বা ডিম্বাণু হিমায়িতকরণ হল এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে মহিলার ডিম্বাশয় থেকে পরিণত ডিম্বাণু সংগ্রহ করে বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সেই ডিম্বাণু ব্যবহার করে আইভিএফ পদ্ধতিতে গর্ভধারণের চেষ্টা করা যেতে পারে।যাঁরা ব্যক্তিগত বা পেশাগত কারণে মাতৃত্বের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে চান, তাঁদের কাছে এটি একটি বিকল্প হতে পারে। তবে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই ভবিষ্যতে সন্তানধারণ নিশ্চিত হয় না। সংরক্ষিত ডিম্বাণুর সংখ্যা, গুণমান, সংরক্ষণের সময়কার বয়স এবং পরবর্তী চিকিৎসার ফলাফলের উপর সাফল্য নির্ভর করে।
কোন বয়সে এগ ফ্রিজিং করানো সবচেয়ে ভালো?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমানের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। সাধারণত ৩০ বছরের পর থেকেই ডিম্বাণুর গুণমান ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ৩৫ বছরের পর এই পতন আরও স্পষ্ট হয়। ৪০ বছরের কাছাকাছি পৌঁছলে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান দুটিই অনেকের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।সেই কারণে ভবিষ্যতে সন্তানধারণের পরিকল্পনা থাকলে তুলনামূলক কম বয়সে এগ ফ্রিজিং নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো। অনেক ক্ষেত্রে ৩০–৩৫ বছরের মধ্যে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যতের জন্য তুলনামূলক ভালো সম্ভাবনা থাকতে পারে।তবে প্রত্যেক মহিলার শারীরিক অবস্থা ও ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা এক নয়। তাই শুধু বয়সের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
৩৫ বা ৪০ বছরের পর কি এগ ফ্রিজিং বিপজ্জনক?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বোঝা জরুরি। ৩৫ বা ৪০ বছর পার হলেই ডিম্বাণু হিমায়িতকরণ বিপজ্জনক হয়ে যায়, এমন কোনও সর্বজনীন নিয়ম নেই। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমে যাওয়ায় পর্যাপ্ত ভালো মানের ডিম্বাণু সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে সন্তানধারণের সম্ভাবনাও কমতে পারে।
বেঙ্গালুরুর সারজাপুরের মাদারহুড ফার্টিলিটি অ্যান্ড আইভিএফ-এর কনসালট্যান্ট ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট ডঃ মধু পাটিলের বক্তব্য অনুযায়ী, উন্নত প্রযুক্তি ও চিকিৎসাপদ্ধতির কারণে বর্তমানে এগ ফ্রিজিং আগের তুলনায় আরও সহজলভ্য হয়েছে। তবে বয়স ও ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসার ফলাফল আলাদা হতে পারে।
তাই ৩৫ বা ৪০ বছরের পর এই পদ্ধতি করানোর কথা ভাবলে আগে ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কীভাবে কাজ করে ডিম্বাণু সংরক্ষণের পদ্ধতি?
এগ ফ্রিজিংয়ের প্রক্রিয়ায় সাধারণত কয়েকটি ধাপ থাকে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা: প্রথমে মহিলার চিকিৎসার ইতিহাস খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি AMH পরীক্ষা এবং আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা ও অ্যানট্রাল ফলিকলের সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়।
হরমোন ইনজেকশন: ডিম্বাশয়ে একাধিক ফলিকল পরিণত করার জন্য সাধারণত ৮–১০ দিন হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়। এই সময়ে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়।
ডিম্বাণু সংগ্রহ: ফলিকল পরিণত হলে নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ চিকিৎসাপদ্ধতিতে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়।
হিমায়িত করে সংরক্ষণ: সংগ্রহ করা পরিণত ডিম্বাণু বিশেষ প্রযুক্তিতে দ্রুত হিমায়িত করে রাখা হয়। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সেগুলি আইভিএফ পদ্ধতিতে ব্যবহারের সুযোগ থাকে।
ডঃ মধু পাটিলের মতে, অধিকাংশ মহিলা এই প্রক্রিয়া সহ্য করতে পারেন এবং চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে দ্রুত স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে যেতে পারেন। তবে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা এক রকম হয় না।
এগ ফ্রিজিং করানোর আগে কী কী বিষয় মাথায় রাখবেন?
ডিম্বাণু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় জানা জরুরি।
- নিজের বয়স ও ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা সম্পর্কে পরীক্ষা করান।
- AMH এবং আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
- কতগুলি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে, তা জেনে নিন।
- ভবিষ্যতে আইভিএফের প্রয়োজন ও সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কে ধারণা নিন।
- চিকিৎসার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ঝুঁকি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জানুন।
- সংরক্ষিত ডিম্বাণু ব্যবহার করলেই যে গর্ভধারণ নিশ্চিত হবে না, তা মাথায় রাখুন।
বলিউড অভিনেত্রী কাজলের বোন তানিশা মুখার্জি জানিয়েছেন, ৩৯ বছর বয়সে তিনি নিজের ডিম্বাণু হিমায়িত বা সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে এগ ফ্রিজিং নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহিলাদের ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমতে থাকে। বিশেষ করে ৩৫ বছরের পর এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়। তবে এগ ফ্রিজিংয়ের জন্য কোনও নির্দিষ্ট বয়সের পর পদ্ধতিটি বিপজ্জনক হয়ে যায়, এমন নয়। বয়স বাড়লে বরং সফলতার সম্ভাবনা কমতে পারে।








