হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হলে অনেকেই হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা করেন। কিন্তু বুকে কোনও যন্ত্রণা না থাকলেও যে হৃদযন্ত্রের গুরুতর সমস্যা হতে পারে, তা অনেকেরই অজানা। কখনও সামান্য বদহজম, ক্লান্তি বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যান অনেকে। অথচ এই লক্ষণগুলির পিছনেও থাকতে পারে হার্ট অ্যাটাকের মতো জরুরি পরিস্থিতি। চিকিৎসকদের পরামর্শ, শরীরে অস্বাভাবিক কোনও পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
বুকে ব্যথা ছাড়াও হতে পারে হার্ট অ্যাটাক
হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হল বুকে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি। তবে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, মহিলা এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট হতে পারে।ইন্ডিয়ান স্পাইনাল ইনজুরিস সেন্টারের কার্ডিয়াক সায়েন্সেস বিভাগের পরিচালক ও বিভাগীয় প্রধান ডঃ অসীম ধলের বক্তব্য অনুযায়ী, হার্ট অ্যাটাকের কিছু লক্ষণ এতটাই অস্বাভাবিক হতে পারে যে সেগুলিকে অন্য শারীরিক সমস্যার উপসর্গ বলে ভুল করা হয়। ফরিদাবাদের অমৃত হাসপাতালের কনসালট্যান্ট কার্ডিওলজিস্ট আশিস কুমারও সতর্ক করেছেন, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ অবহেলা করা ঠিক নয়।
কাঁধ, বাহু, পিঠ বা চোয়ালে ব্যথা
হার্ট অ্যাটাকের সময় সব সময় বুকেই ব্যথা অনুভূত হয় না। কখনও কাঁধ, এক বা দুই বাহু, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পেটের উপরের অংশে অস্বস্তি হতে পারে। এই ব্যথা কখনও চাপের মতো, কখনও তীব্র যন্ত্রণার মতো অনুভূত হয়।অনেকে এই ধরনের ব্যথাকে পেশির সমস্যা বা বদহজম ভেবে ভুল করেন। কিন্তু এর সঙ্গে অন্য কোনও অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
হঠাৎ অস্বাভাবিক ক্লান্তি
কোনও ভারী কাজ না করেও হঠাৎ খুব ক্লান্ত লাগছে? সামান্য হাঁটাচলা বা দৈনন্দিন কাজ করতেও কি কষ্ট হচ্ছে? এমন অস্বাভাবিক অবসাদও কখনও হৃদযন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণটি অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। সাধারণ ক্লান্তি ভেবে বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে, এমনটা ধরে নেওয়া উচিত নয়।
কোনও কারণ ছাড়াই শ্বাসকষ্ট
হঠাৎ শ্বাস নিতে অসুবিধা হওয়া বা পর্যাপ্ত বাতাস পাচ্ছেন না বলে মনে হওয়াও হার্ট অ্যাটাকের একটি সম্ভাব্য লক্ষণ। এই সমস্যা বুকে ব্যথার সঙ্গে দেখা দিতে পারে, আবার বুকের ব্যথা ছাড়াও হতে পারে।বিশেষ করে বিশ্রামের সময় বা সামান্য পরিশ্রমেই অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট শুরু হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
বমি বমি ভাব বা বমি
অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ হিসেবে বমি বমি ভাব কিংবা বমি হতে পারে। এই লক্ষণকে সাধারণ পেটের সমস্যা বা খাবারে গণ্ডগোল ভেবে ভুল করার আশঙ্কা থাকে।তবে বমি বমি ভাবের সঙ্গে ঠান্ডা ঘাম, শ্বাসকষ্ট বা শরীরের অন্য অংশে ব্যথা দেখা দিলে তা উপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে।
হঠাৎ ঠান্ডা ঘাম হওয়া
আবহাওয়া গরম নয়, শারীরিক পরিশ্রমও করছেন না, অথচ আচমকা ঘাম হচ্ছে? বিশেষ করে ঠান্ডা ঘামের সঙ্গে অস্বস্তি, দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে সতর্ক হওয়া জরুরি।কোনও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই এমন ঘাম হওয়া কখনও হৃদযন্ত্রের জরুরি সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।
মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম ভাব
হঠাৎ মাথা হালকা লাগা, ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হওয়া কিংবা মাথা ঘোরার মতো সমস্যাও হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে দেখা দিতে পারে। অনেকে একে সাধারণ দুর্বলতা বা ক্লান্তি বলে মনে করেন।কিন্তু মাথা ঘোরার সঙ্গে ঠান্ডা ঘাম, শ্বাসকষ্ট বা বুকের অস্বস্তি থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া উচিত।
লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন?
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুকে ব্যথা থাকুক বা না থাকুক, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা কাঁধ-চোয়ালে ব্যথার মতো একাধিক উপসর্গ দেখা দিলে অপেক্ষা করবেন না।
- দ্রুত জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার সাহায্য নিন।
- নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।
- উপসর্গ কমে যাওয়ার অপেক্ষায় সময় নষ্ট করবেন না।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ খেয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করবেন না।
মনে রাখবেন, এই লক্ষণগুলির সব ক'টিই যে হার্ট অ্যাটাকের কারণে হবে, এমন নয়। কিন্তু এগুলির কোনওটি হঠাৎ দেখা দিলে বা একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে থাকলে জরুরি চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
হার্ট অ্যাটাক মানেই বুকে তীব্র যন্ত্রণা—এমন ধারণা অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সব সময় বুকে ব্যথা দিয়েই হৃদরোগের জরুরি পরিস্থিতি প্রকাশ পায় না। কখনও কাঁধ, বাহু, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে অস্বস্তি, আবার কখনও অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব কিংবা ঠান্ডা ঘামও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক, মহিলা এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উপসর্গগুলি অনেক সময় স্পষ্ট হয় না। তাই শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন চিনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।













