মার্কিন অর্থমন্ত্রী বেসেন্টের মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য উত্তেজনা

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বিরুদ্ধে উন্নততর বাণিজ্য চুক্তি প্রত্যাখ্যানের অভিযোগ করেছেন। দুই দেশের মধ্যে শুল্ক, বাজার প্রবেশাধিকার ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত রয়েছে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট কানাডার সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক বিরোধ ব্যাখ্যা করতে কানাডাকে এমন একটি ছোট কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যে বড় কুকুরকে ক্রমাগত ঘেউ ঘেউ করে বিরক্ত করে। তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি উন্নততর বাণিজ্য চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার অভিযোগ করেছেন। তাঁর এই মন্তব্য দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক উত্তেজনাকে সামনে এনেছে।

বেসেন্ট ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেন। এমন সময় তাঁর এই বক্তব্য সামনে এসেছে, যখন শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

বেসেন্ট কানাডার সঙ্গে বর্তমান বাণিজ্য বিরোধ ব্যাখ্যা করতে তাঁর পুরনো জার্মান শেফার্ড কুকুরের উদাহরণ দেন। তিনি জানান, পার্কে একটি ছোট কুকুর তাঁর জার্মান শেফার্ডকে ক্রমাগত ঘেউ ঘেউ করে বিরক্ত করত।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর জার্মান শেফার্ড দীর্ঘ সময় ওই ছোট কুকুরটিকে উপেক্ষা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একদিন তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। বেসেন্ট বলেন, কানাডার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি তাঁকে ওই ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়।

এই মন্তব্যকে কানাডার প্রতি মার্কিন প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।মার্কিন অর্থমন্ত্রী কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বিরুদ্ধে একটি উন্নততর বাণিজ্য চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার অভিযোগও করেছেন। দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে ১৯ থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত তিন দিনের বাণিজ্য আলোচনা হয়েছিল। তবে আলোচনা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি।

কার্নির বক্তব্য ছিল, আলোচনার শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্তে পরিবর্তন এনেছিল। অন্যদিকে, মার্কিন পক্ষের বক্তব্য ছিল, কানাডাকে একটি ভালো প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কানাডা তাতে সম্মত হয়নি।

এই মতপার্থক্যের কারণে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ আরও গভীর হয়েছে।

বেসেন্ট আরও দাবি করেছেন, কানাডার সঙ্গে বর্তমান বাণিজ্যযুদ্ধের মার্কিন মূল্যের ওপর প্রভাব খুবই সামান্য হবে। এমন সময় তাঁর এই বক্তব্য এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে শুল্ক নিয়ে ধারাবাহিকভাবে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে।

বেসেন্ট এর আগেও কার্নিকে নিশানা করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, কানাডার অর্থনীতির জন্য কী ভালো, সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে কানাডার প্রধানমন্ত্রী নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে বেশি চিন্তিত।দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি না হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২২ আগস্ট থেকে কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১.৯ লক্ষ কোটি রুপি মূল্যের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেন।

জানানো হয়, এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো কানাডীয় পণ্যের মোট মূল্যের প্রায় ৫ শতাংশের সমান। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মার্কিন পদক্ষেপকে কানাডার ওপর হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন।

দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা বাণিজ্য বিরোধ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, কানাডা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে রয়েছে, কারণ তাদের ওপর হামলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক বাণিজ্যিক বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। এর মধ্যে অটোমোবাইল, দুগ্ধজাত পণ্য, মদ ও কাঠের ব্যবসা উল্লেখযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, কানাডার কিছু বাণিজ্যনীতি মার্কিন সংস্থাগুলোর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে না। অন্যদিকে, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বিভিন্ন শুল্কে ছাড়ের দাবি করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, কানাডার বাণিজ্যনীতি মার্কিন গাড়ি সংস্থাগুলোকে কানাডার বাজারে সমান সুযোগ দেয় না।

যুক্তরাষ্ট্র চায়, কানাডা তার অর্থনীতিতে মার্কিন গাড়ি এবং অন্যান্য মার্কিন পণ্যের জন্য বাজার আরও উন্মুক্ত করুক। এর জবাবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি ও কাঠের ওপর আরোপিত শুল্কে ছাড়ের দাবি জানিয়েছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এই শুল্ক প্রত্যাহার করতে প্রস্তুত হয়নি।

কানাডা তার দুগ্ধ শিল্পকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষিত রাখতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নিয়ম ও বিধিনিষেধ প্রয়োগ করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্র চায়, তার দুধ, পনির ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য কানাডার বাজারে আরও সহজে প্রবেশের সুযোগ পায়। তবে কানাডা তার অভ্যন্তরীণ দুগ্ধ খাতের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় দিতে এড়িয়ে গেছে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী বেসেন্টের মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য উত্তেজনা

এই বিষয়টিও দুই দেশের আলোচনায় অন্যতম প্রধান বিরোধের কারণ হয়ে রয়েছে।

কানাডার কিছু অঞ্চলে মার্কিন মদ বিক্রির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট। মার্কিন পক্ষ এটিকে তাদের পণ্যের প্রতি বৈষম্য হিসেবে দেখে এবং চায়, কানাডার বাজারে মার্কিন মদ আরও সহজে বিক্রি করা হোক।

এছাড়া সফটউড লাম্বার বা কাঠ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কানাডা থেকে আমদানি করা কাঠের ওপর বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ ও শুল্ক আরোপ করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্কের জবাবে কানাডাও পাল্টা পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, কানাডা মার্কিন শুল্কের ডলার-ফর-ডলার জবাব দেবে।

এই পদক্ষেপের পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একে অপরের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে শুল্ক বহাল থাকলে দুই দেশের ব্যবসা ও ভোক্তা মূল্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের বিরোধ শুধু শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সীমান্ত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ও উত্তেজনার কারণ হয়ে রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়।

তিনি আরও দাবি করেছেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে গেলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ও শুল্ক-সংক্রান্ত অনেক বিরোধের অবসান হতে পারে।

কানাডা এই ধারণা গ্রহণ করেনি এবং কানাডীয় নেতৃত্ব দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দিয়েছে।

ট্রাম্প কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে একাধিকবার কটাক্ষ করে ‘গভর্নর’ বলে সম্বোধন করেছেন। কানাডায় এই মন্তব্যকে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অপমানজনক হিসেবে দেখা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের যাতায়াত এবং ফেন্টানিলের মতো বিপজ্জনক মাদক পাচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্র কানাডার কাছে সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা এবং অবৈধ অভিবাসন ও মাদক পাচার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বর্তমান বিরোধের গুরুত্বের একটি কারণ হলো, দুই দেশ গভীর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভাগ করে। শুল্ক, বাজারে প্রবেশাধিকার ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা মতপার্থক্য আগামী সময়ে দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।

 

Leave a comment