ভেনেজুয়েলায় ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প, জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা

ভে ও ধর অভিযান জোরদার করেছে। ইউএসজিএস প্রাথমিকভাবে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করলেও সরকার এখনো কোনো সরকারি হতাহত সংখ্যা নিশ্চিত করেনি।

ভেনেজুয়েলায় বুধবার সন্ধ্যায় কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রশাসন বৃহৎ পরিসরে ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, প্রথমে ৭.২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয় এবং তার পরপরই ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় কম্পন অনুভূত হয়। দুটি ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ২৯০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত একটি এলাকায়। শক্তিশালী কম্পনের অভিঘাত দেশের বিভিন্ন অংশে অনুভূত হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি বহুতল ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রশাসন ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করেছে।

ইউএসজিএসের প্রাথমিক মূল্যায়নে দুর্যোগের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এ ঘটনায় ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা ৪৪ শতাংশ এবং এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে এগুলো কেবল প্রাথমিক অনুমান। এখন পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা সরকার কোনো সরকারি মৃত বা আহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেনি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বহু এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্ধারণে সময় লাগতে পারে।

রাজধানী কারাকাস সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে। ভূমিকম্পে বহু ভবনে ফাটল দেখা দেয় এবং কয়েকটি ভবন ধসে পড়ে। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কারাকাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়েছে। নিরাপত্তার কারণে বিমানবন্দরটি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একাধিক সরকারি দপ্তর ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও খালি করা হয়েছে। আফটারশকের আশঙ্কায় বহু মানুষ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খোলা স্থানে অবস্থান নিয়েছেন।

ভূমিকম্পের পর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ সারা দেশে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি চিকিৎসক, নার্স এবং জরুরি সেবার কর্মীদের দ্রুত দায়িত্বে ফিরে আসার আহ্বান জানান। তিনি আরও জানান, একাধিক দেশ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যোগাযোগ করে সহায়তা ও সমবেদনা জানিয়েছে। সরকার সেনাবাহিনী এবং জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীকেও উদ্ধারকাজে নিয়োজিত করেছে।

ভেনেজুয়েলায় ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প, জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা

কারাকাস এবং আশপাশের এলাকায় উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। চাকাও পৌরসভার মেয়র গুস্তাভো ডুকে জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ১৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ৫০০-র বেশি উদ্ধারকর্মী বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন। ভারী যন্ত্রপাতি, অনুসন্ধানী কুকুর এবং বিশেষ সরঞ্জামের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়াদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। রাতভর পরিচালিত অভিযানে বহু মানুষকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং কয়েকজন গুরুতর আহত বলে জানানো হয়েছে।

কারাবোবো অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ভ্যালেন্সিয়ার ৬৮ বছর বয়সী বাসিন্দা লুইসা মার্টিনেজ জানান, তাঁর মনে হয়েছিল যে পুরো বাড়িটি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে প্রাণ বাঁচার জন্য প্রার্থনা করছিলেন। তিনি বলেন, জীবনে প্রথমবার এত শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভব করেছেন। আরও অনেক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, ভবনগুলো প্রবলভাবে কাঁপছিল এবং মানুষ বুঝে উঠতে পারছিল না কোথায় আশ্রয় নেবে। ভূমিকম্পের পর বহু মানুষকে কাঁদতে এবং স্বজনদের জড়িয়ে ধরতে দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প অত্যন্ত বিপজ্জনক শ্রেণির মধ্যে পড়ে। রিখটার স্কেলে প্রতিটি একক বৃদ্ধি শক্তির বহুগুণ বৃদ্ধিকে নির্দেশ করে। সেই কারণে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প ৬.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের তুলনায় বহুগুণ বেশি ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উঁচু ভবন, সেতু, সড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। বড় ভূমিকম্পের পরবর্তী আফটারশকও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এগুলো আগেই দুর্বল হয়ে পড়া স্থাপনাগুলোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে।

ভূমিকম্পের পরপরই সুনামি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। মার্কিন সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের উপকূলীয় এলাকার জন্য সতর্কতা জারি করেছিল। পুয়ের্তো রিকো এবং ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের জন্যও সতর্কতামূলক বার্তা দেওয়া হয়। পরে প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে জানানো হয়, কোনো উপকূলীয় এলাকার জন্য আর সুনামির ঝুঁকি নেই। তবে প্রশাসন সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

এদিকে জাপানেও ৬.৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, এর কেন্দ্র ছিল কুজি শহরের উত্তর-পূর্বে। তবে সেখানে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাময়িকভাবে রেল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয় এবং অবকাঠামোর পরিদর্শন শুরু করা হয়। জাপানের কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার এই ভূমিকম্প দেশটির গত ১২৬ বছরের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্পের মধ্যে পড়ে। এর আগে ১৯০০ সালে ৭.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছিল। ১৯৬৭ সালের ৬.৬ মাত্রার ভূমিকম্পে ২০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বর্তমান ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং প্রশাসনের আশা, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

 

Leave a comment