পুজোর ছুটি মানেই শুধু দার্জিলিং, দীঘা কিংবা মন্দারমণি নয়। ভিড় থেকে একটু দূরে গিয়ে যদি জঙ্গল, পাহাড়, ঝরনা আর ইতিহাসের স্বাদ নিতে চান, তাহলে কলকাতার কাছেই রয়েছে একাধিক আকর্ষণীয় গন্তব্য। ঝাড়গ্রামের শালবন ও বেলপাহাড়ি থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরের পাথরা, কুরুম্বেরা দুর্গ ও মোগলমারী—ছোট ছুটিতেই সাজিয়ে নিতে পারেন অন্যরকম ভ্রমণ পরিকল্পনা।
ঝাড়গ্রাম: জঙ্গল, হাতি আর পাহাড়ি ঝরনার টান
কলকাতা থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ পেরোলেই পৌঁছে যাওয়া যায় জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রামে। সবুজ শালবন, গ্রামবাংলার পরিবেশ এবং জঙ্গলের আবহ এই এলাকার অন্যতম আকর্ষণ।ঝাড়গ্রামে ঢোকার পথে কলাবনি এলাকার জঙ্গল প্রকৃতিপ্রেমীদের বিশেষভাবে টানতে পারে। ঘন সবুজের মাঝে পথ চলার সময় বন্য হাতির উপস্থিতির সম্ভাবনাও থাকে। তবে জঙ্গলে হাতি বা অন্য বন্যপ্রাণী দেখলে অবশ্যই দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসন ও বন দফতরের নির্দেশ মেনে চলতে হবে।পুজোর মরশুমে জঙ্গলঘেরা এলাকায় পর্যটকদের জন্য বিশেষ সেলফি পয়েন্ট তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে প্রকৃতির মাঝে ছবি তোলার সুযোগও মিলতে পারে।
ছোটদের নিয়ে গেলে ডিয়ার পার্ক
পরিবারের সঙ্গে ঝাড়গ্রাম গেলে তালিকায় রাখতে পারেন ডিয়ার পার্ক। শহরের মধ্যে সবুজে ঘেরা এই জায়গাটি শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।বিভিন্ন প্রাণী ও পাখি দেখার সুযোগ থাকায় ছোটদের নিয়ে স্বল্প সময়ের বেড়ানোর জন্য এটি ভালো বিকল্প। তবে পার্কে থাকা প্রাণীদের নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
বেলপাহাড়ি: পাহাড়ের কোলে ঘাঘরা জলপ্রপাত
ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে বেলপাহাড়ি। পাহাড়, জঙ্গল আর ঝরনার মেলবন্ধনে এই এলাকা বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বিশেষ সুন্দর হয়ে ওঠে।এখানকার ঘাঘরা জলপ্রপাতের পাথরের গা বেয়ে নেমে আসা জল এবং চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। জলের প্রবাহ বেশি থাকলে দৃশ্য আরও মনোরম হয়। আশপাশে কখনও কখনও ময়ূর-সহ বিভিন্ন পাখি বা বন্যপ্রাণীর দেখা মিলতে পারে। তবে বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।ঝাড়গ্রাম ও বেলপাহাড়ি এলাকায় থাকার জন্য বিভিন্ন হোমস্টে ও হোটেলের ব্যবস্থাও রয়েছে।
পশ্চিম মেদিনীপুর: প্রকৃতির পাশাপাশি ইতিহাসের সফর
ঝাড়গ্রামের পাশাপাশি পশ্চিম মেদিনীপুরও হতে পারে ছোট ছুটির জন্য দারুণ গন্তব্য। বিশেষ করে যাঁরা প্রকৃতির সঙ্গে ইতিহাসকে একই সফরে পেতে চান, তাঁদের জন্য এই জেলার কয়েকটি জায়গা বেশ আকর্ষণীয়।
পাথরা: মন্দিরের গ্রামে ইতিহাসের ছোঁয়া
কংসাবতী নদীর কাছাকাছি পাথরা এলাকা পরিচিত তার বহু প্রাচীন মন্দির ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের জন্য। একসঙ্গে একাধিক মন্দির ও নানা স্থাপত্যশৈলী এই এলাকাকে অন্যরকম করে তুলেছে।বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দিরের মতো জনপ্রিয় না হলেও পাথরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলাদা। পুরনো স্থাপত্যের সামনে দাঁড়ালে বাংলার অতীতের নানা অধ্যায় যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ইতিহাস ও স্থাপত্যে আগ্রহীদের জন্য তাই পাথরা হতে পারে চমৎকার একটি গন্তব্য।
কুরুম্বেরা দুর্গ: পাথরের খিলানে লুকিয়ে ইতিহাস
মেদিনীপুর শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে কেশিয়াড়ি ব্লকের গগনেশ্বর এলাকায় রয়েছে ঐতিহাসিক কুরুম্বেরা দুর্গ।উঁচু পাথরের দেওয়াল ও খিলানঘেরা এই স্থাপত্যে এখনও অতীতের ছাপ স্পষ্ট। এই স্থাপনার মূল ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ এটিকে সামরিক ছাউনি হিসেবে দেখেন, আবার অন্য মত অনুযায়ী এর সঙ্গে ধর্মীয় বা বিশ্রামস্থলের ব্যবহারও যুক্ত থাকতে পারে।তাই শুধু ছবি তোলার জায়গা হিসেবে নয়, ইতিহাসের নানা স্তর জানতে আগ্রহীদের কাছেও কুরুম্বেরা আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।
মোগলমারী বৌদ্ধবিহার: মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা অতীত
কুরুম্বেরা ঘুরে কাছাকাছিই যাওয়া যায় মোগলমারী বৌদ্ধবিহারে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে মাটির নীচ থেকে এই প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন সামনে এসেছে।প্রাচীন বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহ থাকলে এই জায়গা সফরে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এক সফরেই কুরুম্বেরা ও মোগলমারী ঘুরে দেখার ফলে ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য সময়ও ভালোভাবে কাজে লাগবে।
এক ট্রিপে প্রকৃতি ও ইতিহাস—দুই-ই
ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল, এখানে একই সফরে একদিকে জঙ্গল ও ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়, অন্যদিকে প্রাচীন স্থাপত্য ও প্রত্নস্থলের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।একদিনের ছোট ট্রিপে ঝাড়গ্রাম শহর ও আশপাশের জায়গা বেছে নিতে পারেন। আর হাতে দু’দিন সময় থাকলে বেলপাহাড়ি, পাথরা, কুরুম্বেরা ও মোগলমারীর মতো জায়গাগুলিকে পরিকল্পনায় রাখা যেতে পারে।
যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখুন
জঙ্গল বা ঝরনা এলাকায় যাওয়ার আগে স্থানীয় আবহাওয়া ও রাস্তার পরিস্থিতি জেনে নেওয়া ভালো। বর্ষার পর জলপ্রপাতের কাছে পাথর পিচ্ছিল থাকতে পারে, তাই সাবধানে চলাফেরা করতে হবে।জঙ্গলে বন্যপ্রাণী দেখার চেষ্টা করতে গিয়ে কখনও গাড়ি থামিয়ে প্রাণীর কাছে যাওয়া বা তাদের উত্যক্ত করা উচিত নয়। একইভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনায় কোনও ধরনের ক্ষতি না করে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ঘুরতে হবে।
পুজোর ছুটিতে খুব বেশি দূরে যেতে চান না? কলকাতা থেকে কয়েক ঘণ্টার পথেই রয়েছে জঙ্গল, বন্যপ্রাণী, ঝরনা, নদী এবং ইতিহাসের অসাধারণ মেলবন্ধন। পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম—এই দুই জেলায় একসঙ্গে পাওয়া যাবে প্রকৃতি ও ইতিহাসের নানা আকর্ষণ। একদিন বা দু’দিনের ছোট্ট ট্রিপে পরিবার, বন্ধু কিংবা একাই ঘুরে দেখার জন্য জায়গাগুলি হতে পারে দারুণ বিকল্প।













