বাংলার মাটিতে ছড়িয়ে থাকা মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শনগুলির মধ্যে অন্যতম হল বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের জোর মন্দির। মল্লভূমের রাজাদের শিল্পপ্রীতি ও ধর্মনিষ্ঠার এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে এই মন্দিরগুচ্ছ। শুধু ধর্মীয় আবহ নয়, ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছেও এটি এক অনন্য আকর্ষণ।
মল্লভূমের গৌরব: বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্য
Bishnupur শহর মানেই পোড়ামাটির শিল্প, প্রাচীন মন্দির ও বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যরীতির এক অপূর্ব সমাহার। সেই ঐতিহ্যের উজ্জ্বলতম উদাহরণগুলির একটি হল Jor Mandir। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত এই মন্দির কমপ্লেক্স শুধু উপাসনাকেন্দ্র নয়, বরং বাংলার মধ্যযুগীয় শিল্পঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।
ASI-র সুরক্ষায় ঐতিহাসিক সম্পদ
বর্তমানে জোর মন্দির সুরক্ষিত রয়েছে Archaeological Survey of India (ASI)-র তত্ত্বাবধানে। ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যমূল্যের বিচারে এই স্থানটি জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। ফলে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে এটি একটি অবশ্যদ্রষ্টব্য স্থান হয়ে উঠেছে।
১৭২৬ সালের নির্মাণ, মল্লরাজের কীর্তি
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৭২৬ সালে মল্লরাজ গোপাল সিংহ দেবের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হয় এই মন্দিরগুচ্ছ। মল্লভূমের রাজারা শিল্প ও সংস্কৃতির বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাদের সময়েই বিষ্ণুপুরে গড়ে ওঠে একাধিক মন্দির, যা আজও বাংলার গৌরব বহন করছে।
এক-রত্ন শৈলীর অনন্য স্থাপত্য
জোর মন্দির আসলে তিনটি এক-রত্ন শৈলীর মন্দির নিয়ে গঠিত। উত্তর ও দক্ষিণের দুটি মন্দির তুলনায় বড়, আর মাঝখানেরটি কিছুটা ছোট। প্রতিটি মন্দিরে দোচালা আকৃতির বাঁকানো ছাদ ও তার উপর একক চূড়া রয়েছে—যা বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যরীতির স্পষ্ট পরিচয় দেয়।
টেরাকোটার কারুকাজে ইতিহাসের কাহিনি
মন্দিরগুলোর প্রধান আকর্ষণ পোড়ামাটির সূক্ষ্ম টেরাকোটা অলংকরণ। পৌরাণিক কাহিনি, দেবদেবীর মূর্তি, যুদ্ধদৃশ্য এবং সমকালীন সমাজজীবনের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে এই কারুকাজে। ল্যাটেরাইট পাথরের গাঁথুনির উপর এমন শিল্পকর্ম বিষ্ণুপুরকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছে।
জোড়-বাংলা মন্দিরের সঙ্গে নামের মিল, স্থাপত্যে পার্থক্য
বিষ্ণুপুরেই অবস্থিত আরেক ঐতিহাসিক স্থাপনা Jor Bangla Temple, যা ১৬৫৫ সালে নির্মিত। নামের মিল থাকলেও দুই মন্দিরের স্থাপত্যরীতি সম্পূর্ণ আলাদা। জোর মন্দির এক-রত্ন শৈলীতে নির্মিত হলেও জোড়-বাংলা মন্দিরের গঠন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ।
পোড়ামাটির সূক্ষ্ম কারুকাজ, এক-রত্ন শৈলীর অনন্য স্থাপত্য এবং মল্ল রাজাদের ঐতিহ্যের ছাপ—সব মিলিয়ে জোর মন্দির আজ বাঁকুড়া পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ইতিহাস ও শিল্পের এই অসাধারণ সমন্বয় দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা।













