বাজারে শুকনো অবস্থায় ছোট ছোট টুকরোর মতো দেখতে সয়া চাঙ্ক জলে ভিজলেই ফুলে ওঠে এবং মাংসের মতো টেক্সচার তৈরি করে। ফলে অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে—এটি কি সত্যিই নিরামিষ? উত্তর হল, সাধারণ সয়া চাঙ্ক সম্পূর্ণ উদ্ভিদ-ভিত্তিক। তবে এর মাংসের মতো গঠন তৈরি হওয়ার পিছনে রয়েছে আধুনিক খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণের বিশেষ পদ্ধতি।
সয়া চাঙ্ক আসলে কী?
সয়া চাঙ্ককে অনেক সময় মিল মেকার, সয়া নাগেট বা সয়া চাঙ্ক বলা হয়। সাধারণত এগুলি সয়াবিন থেকে পাওয়া ডিফ্যাটেড বা তেলমুক্ত সয়া উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়।অর্থাৎ, গোটা সয়াবিনকে সরাসরি কেটে বা শুকিয়ে সয়া চাঙ্ক বানানো হয় না। প্রথমে সয়াবিন প্রক্রিয়াজাত করে তার তেল আলাদা করা হয়। এরপর অবশিষ্ট প্রোটিনসমৃদ্ধ অংশকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হয় এই জনপ্রিয় খাবার।
সয়া চাঙ্ক কি আমিষ না নিরামিষ?
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সাধারণ সয়া চাঙ্ক উদ্ভিদজাত এবং নিরামিষ খাবার।মাংসের মতো দেখতে হওয়া বা রান্নার পর মাংসের মতো চিবোনো অনুভূতি পাওয়া মানেই এতে প্রাণিজ উপাদান রয়েছে—এমনটা নয়। তবে কোনও নির্দিষ্ট প্যাকেটজাত পণ্যে অতিরিক্ত উপাদান মেশানো হয়েছে কি না, তা জানতে অবশ্যই প্যাকেটের ingredients list দেখে নেওয়া উচিত।
কীভাবে তৈরি হয় সয়া চাঙ্ক?
প্রথমে ভালো মানের সয়াবিন বাছাই করে ধুলো, পাথর ও অন্যান্য অপদ্রব্য সরানো হয়। এরপর সয়াবিন পরিষ্কার করে শুকিয়ে তার খোসা আলাদা করা হয়।পরবর্তী ধাপে সয়াবিন থেকে প্রাকৃতিক তেল বের করে নেওয়া হয়। তেল আলাদা হয়ে যাওয়ার পর যে অংশটি থাকে, সেটিতে প্রোটিনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
তেল বের করার পরই শুরু আসল কাজ
তেলমুক্ত সয়া উপাদানকে গুঁড়ো করে ময়দার মতো তৈরি করা হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী জল মিশিয়ে নির্দিষ্ট ঘনত্বের মিশ্রণ তৈরি করা হয়।এই মিশ্রণকে পাঠানো হয় এক্সট্রুডার নামের বিশেষ যন্ত্রে। উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের মধ্যে এই প্রক্রিয়ায় সয়া প্রোটিনের গঠন বদলে যায়। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় সয়া চাঙ্কের পরিচিত আঁশযুক্ত বা মাংসের মতো টেক্সচার।
জলে ভিজলেই কেন ফুলে যায়?
এক্সট্রুশনের পর নির্দিষ্ট আকারে কেটে সয়া চাঙ্ককে শুকিয়ে নেওয়া হয়। তাই বাজারে এগুলি সাধারণত হালকা ও শক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।বাড়িতে রান্নার আগে গরম বা উষ্ণ জলে ভিজিয়ে রাখলে শুকনো সয়া চাঙ্ক জল শুষে নেয়। ফলে আকারে বড় হয়, নরম হয়ে যায় এবং এর গঠন অনেকটা মাংসের মতো মনে হয়।এই কারণেই সয়া চাঙ্ক দিয়ে তৈরি তরকারি বা বিরিয়ানিতে অনেক সময় মাংসের বিকল্পের মতো অনুভূতি পাওয়া যায়।
প্রোটিনের জন্যও জনপ্রিয়
সয়া-ভিত্তিক এই খাবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান হল প্রোটিন। এর পাশাপাশি কার্বোহাইড্রেট, কিছু ফাইবার, অল্প পরিমাণ ফ্যাট এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদানও থাকতে পারে।তবে সব ব্র্যান্ডের সয়া চাঙ্কের পুষ্টিগুণ এক নয়। উৎপাদন পদ্ধতি ও উপাদানের অনুপাত অনুযায়ী পার্থক্য হতে পারে। তাই কেনার সময় প্যাকেটের Nutrition Facts এবং উপাদানের তালিকা দেখে নেওয়াই ভালো।
সয়াবিনের তুলনায় এত সস্তা কেন?
এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সয়াবিন প্রক্রিয়াজাত করার সময় তার তেল আলাদা করে নেওয়া হয় এবং সেটি আলাদাভাবে বিক্রি করা যায়। এরপর তেলমুক্ত অবশিষ্ট সয়া উপাদান দিয়েই তৈরি করা হয় সয়া চাঙ্কের মতো পণ্য।তাই গোটা সয়াবিনের দাম আর তৈরি সয়া চাঙ্কের দাম সরাসরি তুলনা করলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যায় না।আর একটি বিষয় হল—শুকনো সয়া চাঙ্ক জলে ভিজলে আকারে অনেকটাই বেড়ে যায়। ফলে অল্প পরিমাণ শুকনো পণ্য দিয়েই তুলনামূলক বেশি পরিমাণ রান্না করা সম্ভব হয়।
কারি, বিরিয়ানি থেকে শুরু করে ফ্রাই—সয়া চাঙ্ক বা মিল মেকার এখন বহু বাড়ির রান্নায় জনপ্রিয়। দেখতে ও খেতে অনেকটা মাংসের মতো হলেও এটি আসলে উদ্ভিদজাত খাবার। সয়াবিন থেকে তেল বের করার পর অবশিষ্ট প্রোটিনসমৃদ্ধ অংশ দিয়েই মূলত তৈরি হয় এই খাবার। কীভাবে তৈরি হয় এবং সস্তা হওয়ার রহস্যই বা কী?













