ভারত ও জাপান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রথম যৌথ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন প্রকল্প শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় দুই দেশ যৌথভাবে ‘ইউনিকর্ন’ (Unified Complex Radio Antenna – UNICORN) নামে একটি উন্নত নৌবাহিনীর স্টিলথ অ্যান্টেনা ব্যবস্থা তৈরি করবে। প্রকল্পটির লক্ষ্য ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের যোগাযোগ সক্ষমতা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা এবং স্টিলথ (কম রাডার শনাক্তযোগ্যতা) প্রযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করা।
এই চুক্তিকে ভারত-জাপান কৌশলগত অংশীদারিত্বের একটি নতুন পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।
ইউনিকর্ন একটি আধুনিক সমন্বিত নৌবাহিনীর রেডিও অ্যান্টেনা ব্যবস্থা, যা NORA-50 Integrated Mast নামেও পরিচিত। প্রচলিত যুদ্ধজাহাজে বিভিন্ন যোগাযোগ ও সেন্সর অ্যান্টেনা আলাদাভাবে উন্মুক্ত অবস্থায় স্থাপন করা হয়, যার ফলে জাহাজের Radar Cross Section বৃদ্ধি পায়। ইউনিকর্ন প্রযুক্তি এসব অ্যান্টেনা এবং ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাকে একটি বিশেষ সুরক্ষামূলক কাঠামো (Radome)-এর মধ্যে সমন্বিত করে।
এর ফলে যুদ্ধজাহাজের বাহ্যিক গঠন আরও সুসংগঠিত হয় এবং রাডারে তার শনাক্তযোগ্যতা কমে যায়। কম রাডার সংকেতের কারণে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের জন্য জাহাজ শনাক্ত করা এবং তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
![]()
এই সমন্বিত ব্যবস্থায় ট্যাকটিক্যাল ডেটা লিঙ্ক, ট্যাকটিক্যাল এয়ার নেভিগেশন সিস্টেম (TACAN), আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, IFF (Identification Friend or Foe) এবং ইলেকট্রনিক সাপোর্ট মেজারস (ESM) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধজাহাজ নিরাপদ যোগাযোগ বজায় রাখা, মিত্র ও শত্রুর পরিচয় শনাক্ত করা এবং ইলেকট্রনিক সংকেত বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়।
ইউনিকর্ন ব্যবস্থা জাপানের NEC Corporation, Sampa Kogyo K.K. এবং The Yokohama Rubber Company যৌথভাবে উন্নয়ন করেছে। বর্তমানে এই প্রযুক্তি জাপান মেরিটাইম সেলফ-ডিফেন্স ফোর্স (Japan Maritime Self-Defense Force – JMSDF)-এর আধুনিক Mogami-class স্টিলথ ফ্রিগেটে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাপান ইতোমধ্যে এই শ্রেণির একাধিক যুদ্ধজাহাজ নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অতিরিক্ত জাহাজ নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে।
এই প্রকল্পের অধীনে ভারতে ইউনিকর্ন ব্যবস্থার সহ-উৎপাদনের দায়িত্ব ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড (BEL)-এর ওপর ন্যস্ত হবে। জাপান উন্নত নকশা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা সরবরাহ করবে, আর ভারত ব্যবস্থাটির উৎপাদন, একীকরণ এবং স্থানীয় উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই উদ্যোগকে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে উৎসাহিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পের ভিত্তি ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত Memorandum of Implementation-এর মাধ্যমে স্থাপিত হয়। এর আগে ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত ভারত-জাপান ২+২ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠে। যৌথ উন্নয়ন প্রকল্প ঘোষণার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ভাগাভাগির সহযোগিতা এখন বাস্তব রূপ পাচ্ছে।
বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বৈশ্বিক কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও জাপান উভয়ই সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অবাধ নৌচলাচল এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনিকর্নের মতো উন্নত প্রযুক্তি ভারতীয় নৌবাহিনীর পরিচালন সক্ষমতা, নজরদারি ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রস্তুতিকে আধুনিক করে তুলবে।










