একসময় ঝুলন মানেই ছিল পাড়ায় পাড়ায় উৎসবের আমেজ, বাড়ি ও মন্দিরে রাধা-কৃষ্ণের সুসজ্জিত দোলনা আর সন্ধ্যা নামলেই ভক্তদের ভিড়। সময়ের সঙ্গে সেই ছবিতে এসেছে বদল। স্মার্টফোন ও রিলসের যুগে অনেকটাই কমেছে ঝুলনের জৌলুস। তবে উত্তর ২৪ পরগনার গঙ্গা তীরবর্তী কয়েকটি পুরনো জনপদ এখনও আঁকড়ে ধরে রেখেছে সেই ঐতিহ্য। পানিহাটি থেকে খড়দহ—আজও সেখানে দোলনায় দুলছেন রাধা-কৃষ্ণ।
সময় বদলেছে, বদলেছে ঝুলনের ছবিও
একসময় বাংলার ঘরে ঘরে ঝুলন উৎসব ঘিরে থাকত আলাদা উন্মাদনা। বাড়ির ছোটরা উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকত, সাজানো হত রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি। অনেক পাড়াতেও তৈরি হত বিশেষ ঝুলন মঞ্চ।কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে বদলে গিয়েছে মানুষের বিনোদনের ধরন। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তারে আগের মতো ঝুলনকে কেন্দ্র করে সর্বত্র উৎসবের আবহ দেখা যায় না। বহু জায়গায় কমেছে পারিবারিক ও পাড়ার উদ্যোগে ঝুলন আয়োজনের সংখ্যাও।
পানিহাটি-খড়দহে এখনও টিকে পুরনো রীতি
তবে ছবিটা পুরোপুরি হতাশার নয়। উত্তর ২৪ পরগনার গঙ্গা তীরবর্তী বেশ কিছু এলাকায় এখনও পুরনো নিয়ম মেনে ঝুলন পালন করা হয়।পানিহাটি, খড়দহ, সোদপুর ও বরানগর-সহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি এবং মন্দিরে রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি সাজিয়ে দোলনায় বসানোর আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভক্তদের উপস্থিতিও চোখে পড়ছে।
নতুন প্রজন্মও ফিরছে ঐতিহ্যের কাছে
ঝুলন উৎসব থেকে নতুন প্রজন্ম অনেকটাই দূরে সরে গিয়েছে—এমন অভিযোগ থাকলেও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলানোর ইঙ্গিতও মিলছে। ঐতিহ্য ও স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী অনেকের মতে, এখনকার ছেলে-মেয়েদের মধ্যেও ঝুলন দেখার কৌতূহল তৈরি হচ্ছে।অনেকে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে পুরনো মন্দির ও ঝুলন দেখতে আসছেন। ফলে সামাজিক মাধ্যমের যুগেও প্রাচীন এই উৎসবের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের একটা যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে।
শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলার সংস্কৃতির অংশ
ঝুলন যাত্রা কেবল রাধা-কৃষ্ণের দোলনাকে কেন্দ্র করে পালিত একটি উৎসব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার লোকাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি এবং স্থানীয় জনজীবনের বহু পুরনো স্মৃতি।আগের মতো সর্বত্র বড় আয়োজন না হলেও গঙ্গার ধারের পুরনো জনপদগুলিতে এখনও এই উৎসব ঘিরে তৈরি হয় আলাদা আবহ। কোথাও মন্দিরে বিশেষ সাজসজ্জা, কোথাও বাড়ির উঠোনে দোলনা—সব মিলিয়ে ফিরে আসে পুরনো দিনের স্মৃতি।
হারিয়ে যাবে না তো ঝুলনের ঐতিহ্য?
আধুনিকতার প্রভাবে উৎসবের ধরন বদলানো স্বাভাবিক। কিন্তু ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে ঝুলন যাত্রার জনপ্রিয়তা ফের বাড়তে পারে। স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের আশা, পুরনো রীতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ যুক্ত হলে আবারও ঝুলন উৎসবের হারানো জৌলুস অনেকটাই ফিরবে।
স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া আর ডিজিটাল বিনোদনের দাপটে আগের মতো জাঁকজমক নেই ঝুলন উৎসবে। তবুও উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি, খড়দহ, সোদপুর ও বরানগরের মতো গঙ্গা তীরবর্তী এলাকায় এখনও পুরনো রীতি মেনেই পালিত হচ্ছে ঝুলন যাত্রা। রাধা-কৃষ্ণের দোলনা, ভক্তদের সমাগম আর স্থানীয় মানুষের উৎসাহে টিকে রয়েছে বাংলার এই প্রাচীন ঐতিহ্য।










