সীমাহীন দারিদ্র্য থেকে বিশ্বমঞ্চে বাংলার তাঁতশিল্প—কালনার জ্যোতিষ দেবনাথের শাড়ি আজ লাখ-লাখ টাকার

কালনার তাঁতি জ্যোতিষ দেবনাথের জীবনসংগ্রামের গল্প। অভাব থেকে শুরু করে আজ তাঁর মসলিন-জামদানি শাড়ির দাম লাখ টাকা, ছড়িয়ে বিশ্বজুড়ে।

সংগ্রাম, ধৈর্য আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি—এই তিনের সমন্বয়েই যে সাফল্যের নতুন ইতিহাস লেখা যায়, তার জীবন্ত উদাহরণ কালনার তাঁতি জ্যোতিষ দেবনাথ। একসময় যাঁর সংসারে নুন-ভাত জোটানোই ছিল চ্যালেঞ্জ, আজ তাঁর হাতে তৈরি শাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে। লাখ-লাখ টাকা দামের মসলিন-জামদানি শাড়ি তৈরি করে তিনি আজ বিশ্বদরবারে পরিচিত নাম।

দেশভাগের যন্ত্রণা আর অভাবেই শুরু জীবনসংগ্রাম

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় বাংলাদেশের নোয়াখালি ছেড়ে পূর্ব বর্ধমানের কালনা-২ ব্লকের দত্তদ্বারিয়াটন গ্রামে আশ্রয় নেয় জ্যোতিষ দেবনাথের পরিবার। সংসারে তখন ১১ জন সদস্য, উপার্জনের একমাত্র ভরসা ছিলেন তাঁর বাবা। জীবিকার তাগিদে ঠাকুরদা দেবেন্দ্রমোহন দেবনাথ সারাদিন গামছা বুনে হাটে বিক্রি করতেন। সেই সূত্র ধরেই পরিবারে ঢুকে পড়ে তাঁতশিল্প।

অল্প পড়াশোনা, বড় স্বপ্ন

১৯৫৮ সালে জন্ম জ্যোতিষ দেবনাথের। ছোটবেলা থেকেই সংসারের অভাব তাঁকে বাস্তববাদী করে তোলে। কালনার মহারাজা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার পর বাবার হাত ধরেই শুরু হয় তাঁর তাঁতজীবন। বাবার নিষ্ঠা ও পরিশ্রমই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

মসলিনে জামদানির নতুন অধ্যায়

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতিষ দেবনাথ শুধু একজন তাঁতি নন, হয়ে ওঠেন একজন উদ্ভাবক। যখন মসলিন মানেই সাধারণ বুনন, তখন তিনিই প্রথম মসলিনের সঙ্গে জামদানির শৈল্পিক কাজের সংযোজন ঘটান। গামছা ও খাদির গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর হাতে মসলিন পৌঁছে যায় এক নতুন উচ্চতায়। লক্ষ্য একটাই—বাংলার জামদানিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা।

কালনা থেকে আমেরিকা-জাপান—বিশ্বজুড়ে চাহিদা

দীর্ঘ কয়েক দশকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল আজ হাতেনাতে পাচ্ছেন জ্যোতিষ দেবনাথ। তাঁর তৈরি শাড়ি রফতানি হচ্ছে আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া-সহ একাধিক দেশে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে তিনি রিলায়েন্স গ্রুপের একটি বিশেষ প্রকল্পে যুক্ত, যেখানে মুকেশ আম্বানির স্ত্রী নীতা আম্বানির জন্য তৈরি করছেন দুটি বিশেষ শাড়ি—প্রতিটির মূল্য প্রায় ১০ লক্ষ টাকা।

সাফল্যের মাঝেও সমাজের কথা ভাবনা

নিজের সাফল্যের পাশাপাশি সমাজকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে চান জ্যোতিষ দেবনাথ। তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে বহু মানুষ আজ স্বাবলম্বী। রাষ্ট্রপতি পুরস্কার-সহ একাধিক সম্মানে ভূষিত এই তাঁতি সম্প্রতি পেতে চলেছেন দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মশ্রী।

একসময় অভাবের সংসারে গামছা বুনে জীবনযাপন, আর আজ তাঁর হাতে তৈরি মসলিন-জামদানি শাড়ির দাম পৌঁছেছে লক্ষাধিক টাকায়। পূর্ব বর্ধমানের কালনার তাঁতি জ্যোতিষ দেবনাথ আজ শুধু বাংলার নয়, দেশের গর্ব।

Leave a comment